‘লকডাউন ও অন্যরকম ঈদ’

করোনার এই সময়টাতে এমনি কেটে গেল ২টি ঈদ। এর মাঝেও ঈদের আনন্দ থেমে ছিল না। আর তাই স্বপ্নইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন আয়োজন করেছিল ‘লকডাউন ও অন্যরকম ঈদ’ নামে একটি ইভেন্ট, যাতে অংশগ্রহণ করে অনেকেই জানিয়েছেন তাদের নিজেদের ঈদের অভিজ্ঞতা। আর তার মধ্য থেকে নির্বাচিত প্রথম তিনজন এর লেখার আজ তৃতীয় লেখাটি ছাপানো হলো-

“স্বপ্ন কিনবেন ভাই স্বপ্ন?

হরেক রঙের স্বপ্ন আছে, লাল নীল সবুজ?

৭০ বছর এর এক বৃদ্ধ মোটর সাইকেল ভাড়া করে বয়স্ক ভাতা তুলতে যাচ্ছিলেন। বয়স্ক ভাতার সামান্য কটা টাকা দিয়ে ছোট মেয়ের বিয়ে, বড় ছেলের মেয়েটার জন্য ঈদের নতুন জামা, তার স্ত্রীর কালো ফ্রেমের চশমা। বাইরে দমকা হাওয়া, অঝোরে বৃষ্টি তাও ছুটে চলছিলেন লোকটি। অন্ধকারে হঠাত্ই আমফানের তাণ্ডবে একটা গাছের ডাল ভেঙে মাথায় পরে তার। রক্তাক্ত হয় শরীর, মাটি চাপা পরে নিম্নবিত্ত সুখী পরিবারের হাজারো স্বপ্ন।

রিকশাওয়ালা ছগীর মিঞা কোন যাত্রী পাচ্ছেন না, রোদের মধ্যে এ গলি থেকে ওগলি চষে বেড়াচ্ছেন তিনি। অগত্যা এক পথচারী এসে বললেন, “ যাবেন মামা, শাহ আলীবাগ, ভাড়া কত? উঠেন আগে ভাড়া যা দিবেন তাই, ভাড়া নিয়ে তর্ক সে করবে না, একটা পয়সাই এখন তার কাছে স্বর্ণমুদ্রা। তাকে এই টাকা দিয়েই দুবেলা খাবার এর যোগান দিতে হবে। তার জন্যে প্রতিদিনই সাধারণ একটি দিন, ঈদের জন্যে আলাদা কোন আয়োজন নেই!

সন্ধ্যা ৬:৪৫। আজই বেতন হয়েছে আমেনার, গার্মেন্টস থেকে বেড়িয়ে তাই সোজা কাঁচা বাজারে চলে যান। তাকে যে ঈদের বাজার করতে হবে, ছেলেটা এবার সেমাই খাওয়ার জন্য খুব বায়না করেছে, আবার পঙ্গু স্বামী রহমত মিঞার ওষুধও শেষ হয়েছে সপ্তাহখানেক আগেই। কেনাকাটা শেষ করে বাড়ি ফিরছিলেন। হঠাত্ই কারা যেন তাকে ফেলে দিলো রাস্তায়, পিছনে ফিরে দেখলেন একদল মানুষরূপি পশু। অনেক অনুরোধ করেছিলেন তাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য। তাকে যে বাড়ি যেতে হবে, তার ছেলে তার জন্যে অপেক্ষা করছে। কিন্তু হিংস্র পশুর দল মনুষ্যত্বহীন, জাপটে ধরে টেনে হিচরে নিয়ে গেলো আমেনাকে পাশের গলিতে, কয়েকটা আর্তনাদ! কেউ আসলো না বাঁচাতে তাকে। দুমড়ে মুচড়ে শেষ হয়ে গেলো সব স্বপ্ন।

মানুষ যে স্বপ্নপ্রিয়, স্বপ্ন কিনতে ব্যস্ত! করোনার জন্যে প্রিয় ১২০০ একরের ক্যাম্পাস ছেড়ে প্রায় দুই মাস আগেই ফিরতে হলো পরিবারের কাছে। হলো না ক্যাম্পাসের প্রিয় মুখগুলোর সাথে ইফতার, সেহরি, রাত জেগে প্র্যাকটিকাল লিখে সেহরি করা। হয়নি এবার ক্যাম্পাসের দরিদ্র কিছু মুখে হাসি ফোটানো, এতিমখানার বাচ্চাদের মুখের হাসি দেখা! কিন্তু দীর্ঘ চার বছর পর আমি রোযার পুরোটা মাস নিজের পরিবারের সাথে করলাম। ঈদে প্রত্যেকবারের মতো দাদু বাড়ি যাওয়া হয়নি, পিচ্চিদের নিয়ে ঘুরা, সালামি চাওয়া, তাও এই প্যান্ডেমিক সময়ে হাসিমুখে ঈদ উদযাপন করতে পারছি এটাই অনেক। ঈদের আগের দিন সন্ধ্যায় পশ্চিম আকাশে ঈদের চাঁদ আগে দেখার প্রতিযোগিতা, বোনদের হাতে রাত জেগে মেহেদি দিয়ে দেয়া, এমনকি হাতে মেহেদি তাই চার বোন একসাথে একি প্লেটে খাবার খাওয়া এই মুহূর্তগুলো ছিলো অকৃত্রিম। সকালে উঠেই রান্না করে খাওয়া দাওয়া, নতুন জামা পরা,ছবি তোলা, দূরের সবার সাথে অনলাইনে যোগাযোগ করা,ফ্রেন্ডদের উইশ করা, বিকালে শাড়ি পরে ছাদে ঘুরা,আব্বু, আম্মু, ভাই বোনদের সাথে এই যে একাগ্রতা এই জিনিসটাই গত তিন বছর ধরে হয়তো মিস করছিলাম। এমন বদ্ধতার মাঝেই কাটবে আমাদের ঈদুল আযহা!

তাও ওপরের ঐ বৃদ্ধ লোক বা ছগীর মিঞা বা আমেনার থেকে তো আমাদের ঈদ অনেক ভালো কেটেছে তাই না?