বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের অভাব আছে বলিয়া বেকারের অভাব নাই; কিন্তু একটি প্রবণতা বেশ লক্ষণীয়। তাহা হইল—কোনোরকমে চাকুরি পাইয়া গেলে একশ্রেণির চাকুরিজীবী সাধারণত তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকেন না। চাকুরি পাওয়ার পর শুরু হইয়া যায় উপরি আয়ের চিন্তা-ফিকির বা ধান্দা। কেহ পার্টটাইম জব করেন, কনসালট্যান্সি করেন, এনজিওতে কাজ করেন বা ব্যক্তিগত ব্যবসায়-বাণিজ্যে জড়াইয়া পড়েন। ইহাতে অনেক সময় মূল চাকুরি গৌণ হইয়া পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই প্রতিষ্ঠানের মালিক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানের আয়-উন্নতিতে তাহার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ইহা নীতিগতভাবে সমর্থনযোগ্য হইতে পারে না। সেই মূল প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের নিকট হইতে অনুমতি ব্যতীত এমন কাজ করা আইনসিদ্ধও নহে; কিন্তু আমাদের দেশে সচরাচর এমনটি ঘটিতে দেখা গেলেও তাহার বিরুদ্ধে খুব কমই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বলা বাহুল্য, উচ্চশিক্ষার পাদপীঠ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিও এই রোগে আক্রান্ত। এই জন্য গত রবিবার ইউনিভার্সিটি গ্রান্ড কমিশন বা ইউজিসি এই ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া উপাচার্যদের চিঠি দিয়াছে। এই চিঠিতে বলা হইয়াছে, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক-কর্মকর্তা বা কর্মচারী কর্তৃক স্বীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরিবিধি/প্রবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ ও প্রতিপালন করা অবশ্য কর্তব্য।’ এই চাকুরিবিধি/প্রবিধি অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারী যথাযথ কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে অন্য কোনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগতভাবে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা বা কোনো ধরনের লাভজনক প্রতিষ্ঠানের সহিত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকিতে পারেন না।
অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে দেখা যায়, তাহারা বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াইয়া থাকেন। যে সময়টায় তাহার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকিবার কথা, সেই সময়ও তিনি অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কীভাবে পাঠদান করিতে পারেন? ইহা চাকুরিবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন তো বটেই, এমনকি এই ব্যাপারে দিনের পর দিন ব্যবস্থা না নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা। আমরা জানি, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন ও উন্নয়ন খাতে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের চাহিদামতো প্রতি বত্সর সরকার অর্থ বরাদ্দ দিয়া থাকে। সেই অনুযায়ী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা হইয়া থাকে। তাহারা দায়িত্বে অবহেলা করিলে তাহা হইবে এই সরকারি অর্থের অপচয়। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে যেই অর্থ বরাদ্দ করা হইয়া থাকে, তাহা যথাযথভাবে ব্যয় করা হয় না, অনেক সময় অন্য খাতেও ব্যয় করা হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক মেধাবী শিক্ষক নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রকল্পে সম্পৃক্ত হইতে না পারিয়া ও এই বরাদ্দ হইতে কোনো সুবিধা না পাইয়া হতাশ হইয়া পড়েন এবং অন্য কোনো বাড়তি আয়ের পথ অনুসন্ধান করেন। এমনটি হওয়াও বাঞ্ছনীয় নহে। আবার দেখা যায়, একশ্রেণির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বিদেশে পড়াশুনা করিতে গিয়া আর দেশে ফিরিয়া আসেন না বা ফিরিয়া আসিলেও অন্যত্র নিয়মবহির্ভূতভাবে কাজে যোগদান করেন। ইহাও গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না। মোটকথা, আমরা যে যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করিব, সেই প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত বিধিবিধান আমাদের অবশ্যই পালন করিতে হইবে।