অভিবাসী এবং দেশে তাদের পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে বড় ভূমিকা পালন করে রেমিট্যান্স। বিশেষ করে কোনো সংকটকালে। এই অর্থ প্রেরণ অর্থনীতির প্রান্তদেশে থাকা জনসংখ্যার জন্য নিরাপত্তার জাল হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখে। দুর্ভাগ্যবশত, সেই ধারাবাহিকতা কোভিড-১৯-এর কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক বলছে যে রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিহাসের সবচেয়ে মন্দ অবস্থায় পতিত হবে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০২০ সালেই ৪৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাত্ মোট রেমিট্যান্সের ২০ শতাংশ কমে আসবে। রেমিট্যান্স কীভাবে কার্যকর হবে এবং করোনা ভাইরাসের সময় এর চেহারা কেমন হবে, সেটা বুঝতে হলে দক্ষিণ এশিয়ার তীব্র আক্রান্ত দেশগুলোর ছকের দিকে তাকাতে হবে।
রেমিট্যান্সের ওপর করোনার প্রভাব
একজন অভিবাসীর নিজ দেশে ব্যয়ের ক্ষমতার ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স একটি মুখ্য বিষয়। বিশ্বের ৬৬টি দেশে রেমিট্যান্স ৫ শতাংশের বেশি অবদান রাখছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে উন্নয়ন পরিকল্পনায় তা আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশ। ২০১৯ সালে ভারতে রেমিট্যান্স এসেছে ৮০ বিলিয়ন ইউএস ডলার।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জিডিপিতে রেমিট্যান্স বড় ভূমিকা রাখে। যেমন নেপালের জিডিপিতে ২৮ শতাংশ এবং পাকিস্তানের জিডিপিতে ৮ শতাংশ আসে রেমিট্যান্স থেকে।
একটি দেশের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলায় রেমিট্যান্স যখন গতির পরিমাপক হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা তিনটি জটিল বিষয়ের ওপর বিশেষভাবে নির্ভর করে : অভিবাসীর নিজ দেশের অর্থনৈতিক সুযোগ, আন্তর্জাতিক অভিবাসনব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেম। করোনা ভাইরাস এই তিন ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে, যা বহুমুখী মানবিক সংকট তৈরি করেছে। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর নির্বিচারে প্রভাব পড়েছে। যদিও বিগত দিনের রেমিট্যান্স প্রবাহ অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল ছিল, কিন্তু কোভিড-১৯-এর পরের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই বিশ্বব্যাপী মহামারি ২৭২ মিলিয়ন অভিবাসীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তাদের আয় ও চাকরির নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে, যে কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেছে এবং অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়েছে। হিসাব করে দেখা গেছে, ২০২১ সালে রিকভারির আগে ২০২০ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় রেমিট্যান্সের পরিমাণ কমে যাবে ২২ শতাংশ। এই ধারণা করছে বিশ্বব্যাংক। তাদের সেন্ট্রাল ব্যাংকগুলো বাত্সরিক হিসাব ধরে দেখিয়েছে, গত এপ্রিল মাসে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স কমেছে ২৫ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ১৪ শতাংশ।
দক্ষিণ এশিয়ায় রেমিট্যান্স নিয়ে বিশ্বব্যাংক মনে করে—
দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক মন্দা একটি বড়সংখ্যক অভিবাসীকে বাধ্য করবে নিজ দেশে ফিরে যেতে। অর্থনৈতিক চরম পরিণতি সামাজিক বিঘ্ন তৈরি করবে, যার ফলে লৈঙ্গিক সহিংসতা ও সামাজিক উত্তেজনার জন্ম নেবে। পারিবারিক রেমিট্যান্স কমে যাওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ায় দশকের পর দশক প্রচেষ্টায় দারিদ্র্য দূরীকরণ, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও আয়বৈষম্য দূরীকরণে যে অগ্রগতি হয়েছিল তা আবার পিছিয়ে পড়বে।
এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ
অন্যান্য খাতের সঙ্গে রেমিট্যান্স শিল্পের ওপর চাপ কমাতে পাবলিক-প্রাইভেট সহযোগিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই অঞ্চলের রেমিট্যান্স শিল্পের গুরুত্ব বিবেচনায় এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের রিজিওনাল অ্যাকশন গ্রুপ অব সাউথ এশিয়ার কাঠামো অনুসারে একটি পলিসি গ্রহণ করা হয়েছিল পাবলিক ও প্রাইভেট খাতকে সহায়তার জন্য, যাতে ঐ খাতগুলো উন্নয়ন প্রতিবন্ধকতাগুলোকে চিহ্নত করতে পারে। এতে চারটি বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, যা দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি অংশীদারির জন্য রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে আসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এই পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য সরকার ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও ইউনাইটেড ন্যাশনস ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের মতো বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর সহায়তায়।
১. রেমিট্যান্স সেবাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা হিসেবে বিবেচনা করে নীতি হিসেবে ঘোষণা করা প্রয়োজন, যাতে রেমিট্যান্স সার্ভিস প্রোভাইডারদের বাজারে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। ব্যাংক ও অন্যান্য অর্থ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান যেহেতু তাদের জন্য উন্মুক্ত, সেখানে এটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন যে ননফিন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলোও যেন উন্মুক্ত থাকে। যেমন মোবাইল অপারেটর, মানি ট্রান্সফার কোম্পানি ও পোস্ট অফিসগুলো। এটা তখনই সম্ভব, যদি দেশগুলো রেমিট্যান্সকে জরুরি সেবা বলে বিবেচনা করে।
২. ফিসক্যাল ও মনিটরিং ইনটেনসিভ : কোভিড-১৯-এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এই অঞ্চলের সরকারগুলো কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এই দেশগুলো বিশেষ বিশেষ করিডরের জন্য লেনদেন ব্যয় সংকোচন করতে ৩ থেকে ৫ শতাংশ ক্যাশব্যাকের ব্যবস্থা করতে পারে।
৩. অভিবাসন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় রেমিট্যান্সকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে :দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কূটনৈতিক পথে নিবিড়ভাবে কাজ করছে অভিবাসিত দেশগুলোর সঙ্গে অভিবাসন ইস্যুতে। কিন্তু নীতিনির্ধারকদের হোস্ট দেশগুলোর বহুমুখী অংশীদারদের সঙ্গে আরেক পা এগিয়ে আলোচনা করা উচিত। সেখানে শুধু হোস্ট দেশগুলোর সরকারই নয়, রেমিট্যান্স সার্ভিস প্রোভাইডাররাও থাকবে।
৪. এসডিজির লক্ষ্য পূরণে গড় ব্যয় কমাতে হবে
এসডিজির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৩০ সাল। সেই হিসাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বৈশ্বিক প্রানডেমিক সুযোগ করে দিয়েছে সার্ভিস প্রোভাইডার এবং অভিবাসিত হওয়া দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে কাজ করার। এর জন্য প্রয়োজন অভিবাসিতের নিজ দেশ ও অভিবাসন হওয়া দেশ—দুই ক্ষেত্রেই প্রযুক্তিগত উত্পাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া। অভিবাসিতের নিজ নিজ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককগুলোর উচিত হবে প্রচলিত পদ্ধতির সার্ভিস প্রোভাইডার এবং ফাইনটেক কোম্পানিগুলোর জন্য Know-your-customer(KYC) সহজ করা এবং নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিধি, যাতে গড় ব্যয় কমানো যায়।
রেমিট্যান্সের সফলতা বা শক্তি নির্ভর করে অভিবাসিত শ্রমিকের পরিবার কীভাবে রেমিট্যান্স ব্যবহার করছে তার ওপর। এই রেমিট্যান্স পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি তৈরিতে সহায়তা করে থাকে। দক্ষিণ এশিয়ায় সামাজিক নিরাপত্তার জাল অত্যন্ত দুর্বল এবং কোথাও কোথাও অনুপস্থিত। রেমিট্যান্স অভিবাসিতের পরিবারকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শক্তি দিয়ে থাকে। কোভিড মহামারির কারণে অনেক পরিবার এখন সঞ্চিত রেমিট্যান্সের অর্থ নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য ব্যয় করছে। এখন তারা আবার দারিদ্র্যের দিকে ফিরে যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের এখন সময় ঐ সব পরিবারের দিকে হাত বাড়িয়ে দেওয়া।
n লেখকদ্বয়: যথাক্রমে বাংলাদেশ সরকারের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব এবং কমিউনিটি লিড, এশিয়া প্যাসিফিক অ্যান্ড গ্লোবাল লিডারশিপ ফেলো, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম
(লেখাটি ইংরেজি থেকে অনূদিত)