ত্রাণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু কথা

করোনাকালীন পরিস্থিতিতে দেশের উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে বন্যা যেন গোদের ওপর বিষফোড়া। এমনিতেই নিকট অতীতে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান আঘাত হেনেছে। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই আবার বন্যা। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ছিল যে এ বছর বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। উত্তরাঞ্চলে প্রতি বছর বন্যা প্রায় নিয়মিত ব্যাপার। এ বছর প্রায় ১৯টি জেলা প্লাবিত হয়েছে। পরিসংখ্যানের তুলনায় সংখ্যাটা আরো বেশি হতে পারে। যেমন—আমার জেলা বন্যাকবলিত হিসেবে চিহ্নিত না হলেও পাশের জেলা বন্যাকবলিত হওয়ায় এরই মধ্যে সেই বন্যার পানি আমার জেলার ২৬টি ইউনিয়নকে প্লাবিত করেছে। বন্যার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি বিষয় হচ্ছে ত্রাণ। এক্ষেত্রে সরকারকে সাধুবাদ জানাই যে, সরকার ত্রাণ সহায়তার ব্যাপারে নিয়মিতভাবে দিকনির্দেশনা দিয়েছে এবং দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রীও সেসব সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন। প্রতি বছর বন্যার সময় আমরা ত্রাণ বিতরণের সংবাদ ও ছবি দেখি। কিন্তু ত্রাণ বিতরণ খোলা চোখে দেখতে গেলে আরো অনেক বিষয়ই নজরে আসে। আগেই বলেছি, আমার পার্শ্ববর্তী জেলা বন্যাপ্রবণ হওয়ায় আমার জেলায়ও প্রতি বছর কিছু কিছু এলাকা প্লাবিত হয়। দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বলতে হয় অতীতে এখানকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ত্রাণ হিসেবে একটি করে এনার্জি বিস্কুট বিতরণ করেছেন। এ বছর এখানে ত্রাণ কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। সরকার সত্যিকার অর্থেই বন্যাদুর্গতদের সহযোগিতা করতে চান। কিন্তু তিনি যাদের মাধ্যমে বন্যাদুর্গতদের সাহায্য করতে চান তাদের ক্ষেত্রে ‘সরষের মধ্যে ভূত’ অবস্থা (আমি আমার এলাকার পরিপ্রেক্ষিতে বলছি)। তাদের কাছে মুখ্য হচ্ছে ত্রাণ বিতরণের ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া। কে ত্রাণ পেল না, কোন বন্যাদুর্গত মানুষ অভুক্ত থাকল, এমনকি না খেয়ে মারা গেলেও তাদের কিছুই যায়-আসে না। অথচ সরকার তো তাদের জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করেছেন, তাহলে কেন বন্যাদুর্গতদের চাতকের মতো ত্রাণের আশায় বসে থাকতে হবে? এক্ষেত্রে সরকারকে ত্রাণ বণ্টন ব্যবস্থায় আরো কিছু বিষয়ে লক্ষ রাখতে হবে। প্রথমত, কতসংখ্যক মানুষ বন্যাকবলিত তার একটি ডেটাবেইজ তৈরি করা একান্ত প্রয়োজন। তাহলে কী পরিমাণ ত্রাণ প্রয়োজন তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হবে। দ্বিতীয়ত, ত্রাণ বিতরণের সময় ত্রাণগ্রহীতার স্বাক্ষর অথবা টিপসই নিতে হবে এবং ত্রাণ বিতরণ শেষে বিতরণকারী সেই স্বাক্ষরের অনুলিপি দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে পাঠাবেন। ই-গভর্ন্যান্সের কল্যাণে এই অনুলিপি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পাঠানো সম্ভব। তৃতীয়ত, সরকার কন্ট্রোল রুমের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সেটি নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু বন্যাপীড়িত অধিকাংশ মানুষই দরিদ্র এবং অনেকের কাছেই মোবাইল ফোন নেই। তারা যাতে কন্ট্রোল রুমের সেবা গ্রহণ করতে পারে সেজন্য ভ্রাম্যমাণ বুথ স্থাপন করা যেতে পারে। তাতে দুর্গত এলাকার জনগণ সরাসরি তাদের অসুবিধার কথা জানাতে পারবেন। আসলে ত্রাণ কোনো দয়া নয়, এটি রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে দুর্যোগাক্রান্ত ব্যক্তির ন্যায্য পাওনা। সরকার সেই প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থাও নিয়েছেন। কিন্তু এই উদ্যোগ যাতে বৃথা না যায়, সেজন্য সরষের ভূত তাড়ানোর ব্যবস্থাও করতে হবে, যাতে করে পর্যাপ্ত ত্রাণ প্রকৃত দুর্যোগাক্রান্ত মানুষ পেতে পারে। নিকট অতীতে করোনাকালীন  খাদ্যসাহায্য বিতরণের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অনিয়ম ও দুর্নীতি তো সরকারের অজানা নয়। এবারের বন্যায় ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে যাতে সেই দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য উপরোক্ত পদক্ষেপসমূহ বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানাই। আশা করা যায়, ত্রাণ বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে বন্যাদুর্গতদের দুর্ভোগ অনেকাংশেই লাঘব হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়