এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই—গানটি আমার ভীষণ প্রিয় গানগুলোর একটি। মিতালী মুখার্জির গাওয়া এই গানটি ছাত্রজীবনে আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখত। এই গানটির গীতিকার ও সুরকার আলাউদ্দিন আলী। তার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর তিনি আমাকে এই গানটি রচনার গল্প শোনালেন। একজন গীতিকারকে গান নিয়ে আসার কথা এবং তিনি সুর করবেন বলে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু গীতিকারের কোনো খোঁজ নেই। প্রয়োজনের তাগিদে আলাউদ্দিন আলী নিজেই লিখে ফেললেন গানের কথাগুলো। হয়ে গেল একটি অমর সৃষ্টি। এই সৃষ্টিশীল মানুষটি চিরতরে চলে গেলেন ৯ আগস্ট ২০২০ বিকাল সাড়ে ৫টায়।
আলাউদ্দিন আলী ১৯৫২ সালের ২৪ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী থানার বাঁশবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম জাবেদ আলী ও মাতার নাম জোহরা খাতুন। খুব ছোটবেলা থেকে সংগীতজগতের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল পরিবারে সংগীতচর্চার কারণে। আলাউদ্দিন আলী তার পিতা ওস্তাদ জাবেদ আলী ও ছোট চাচা সাদেক আলীর কাছে প্রথমে সংগীতে শিক্ষা নেন। ১৯৬৮ সালে তিনি যন্ত্রশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে আসেন এবং প্রখ্যাত সুরকার ও সংগীত পরিচালক আলতাফ মাহমুদের সহযোগী হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর তিনি প্রখ্যাত সুরকার আনোয়ার পারভেজ ও অন্য অনেক সুরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। ধীরে ধীরে তিনি একজন সুরকার, বেহালাবাদক, সংগীতজ্ঞ, গীতিকার এবং সংগীত পরিচালক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি সংগীত পরিচালনা করে বেশ প্রশংসিত হন।
‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘ভাত দে’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘চরম আঘাত’, ‘আত্মত্যাগ’, ‘সন্ধিক্ষণ’, ‘ফকির মজনু শাহ’, ‘শত জনমের প্রেম’, ‘ভাই বন্ধু’, ‘যোগাযোগ’, ‘বড় বাড়ির মেয়ে’—এমন অসংখ্য চলচ্চিত্রে তিনি সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়াও তিনি খ্যাতিমান পরিচালক গৌতম ঘোষ পরিচালিত ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ চলচ্চিত্রেও সংগীত পরিচালনা করেছেন। ‘মালা বদল’ নামে তিনি একটি চলচ্চিত্রও বানিয়েছেন, যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন অনজু ঘোষ ও সুব্রত এবং পরিচালনা করেছেন মহম্মদ হান্নান।
লোকজ ও ধ্রুপদি সংমিশ্রণে সৃষ্ট আলাউদ্দিন আলীর সুরের নিজস্ব ধরন বাংলা সংগীতে এক আলাদা বৈশিষ্ট্যের মর্যাদা দিয়েছে। প্রায় চার দশক ধরে তার তৈরি করা গান পেয়েছে বিপুল জনপ্রিয়তা। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের বহু স্বনামধন্য শিল্পী তার সুরে গান করে নিজেদের সমৃদ্ধ করেছেন।
সুরসম্রাট আলাউদ্দিন আলীর সুরে বিখ্যাত আরো কয়েকটি জনপ্রিয় গানের কথা না বললেই নয়, যেমন—‘ইস্টিশনের রেলগাড়িটা মাইপা চলে ঘড়ির কাঁটা’, ‘হয় যদি বদনাম হোক আরো’, ‘আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার’, ‘সবাই বলে বয়স বাড়ে আমি বলি কমে রে’, ‘পারি না ভুলে যেতে স্মৃতিরা মালা গেঁথে’, ‘ভেঙেছে পিঞ্জর মেলেছে ডানা’, ‘আমার মনের ভেতর অনেক জ্বালা আগুন হইয়া জ্বলে’, ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’, ‘বাড়ির মানুষ কয় আমায় তাবিজ করেছে’, ‘আকাশের সব তারা ঝরে যাবে’, ‘কেন আশা বেঁধে রাখি’, ‘সাগরিকা বেঁচে আছে তোমারই ভালোবাসায়’, ‘দিন কি রাতে সাঁঝ-প্রভাতে’, ‘আমার মতো এত সুখী নয় তো কারো জীবন’, ‘কিছু কিছু মানুষের জীবনে ভালোবাসা চাওয়াটাই ভুল’, ‘তোমাকে চাই আমি আরো কাছে’, ‘তুমি কী কহিলা কানে আগুন দিলা প্রাণে’, ‘কেন তারে আমি এত ভালোবাসলাম’, ‘ভালোবাসি বলিব না আর’, ‘তুমি যদি সুখী হও আমি চলে গেলে’, ‘যদি গো তার দেখা পাইতাম নয়নজলে কথা কইতাম’, ‘আমি আছি থাকব ভালোবেসে মরব’, ‘বাবা বলে গেল আর কোনোদিন গান কোরো না’ ইত্যাদি। এরকম শত শত গান জনপ্রিয় গানের তালিকায় থাকলেও আমার দৃষ্টিতে এগুলো কালজয়ী গান হিসাবে চিহ্নিত। আলাউদ্দিন আলী তার সুরে কতরকম কারুকার্য দেখিয়েছেন মনের মাধুরী মিশিয়ে তা সংগীতজগতের প্রতিটি মানুষ অবগত আছেন।
তাকে আমরা সুরস্রষ্টা বলি বা সুরসম্রাট বলি বা সঙ্গীতজ্ঞ বলি—কোনো অভিধাই তার কীর্তির কাছে পৌঁছাতে পারবে না। এই মহান কীর্তিমান মানুষটি আজ আমাদের মধ্যে নেই। কেমন যেন শূন্যতা অনুভব করছি, হূদয়ের কোথায়ও যেন একটি হাহাকার-সুর ধ্বনিত হচ্ছে। চলে যাওয়ার জন্য আপনার এত তাড়া ছিল কেন আলী ভাই, বুঝতে পারছি না। আপনার সঙ্গে কিছু কাজ করার কথা ছিল আমার। আপনি বলেছিলেন শরীরটা ভালো হলেই আমার সঙ্গে বসবেন, কিন্তু সেই বসা আর হলো না। তবু আমার লেখা একটি গানের কথায় আপনি সুর করে শিল্পী কুমার বিশ্বজিতের কণ্ঠে তুলে দিয়েছেন, সেটাই আমার সান্ত্বনা। বিদেশ থেকে চিকিত্সা শেষে ফিরে এলে ভেবেছিলাম, আপনি আবার মাতিয়ে তুলবেন আপনার গানের ভুবন। যখনই হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে আসেন তখন ভাবি, আবার আপনি গেয়ে উঠবেন—কিবা জাদু জানো...। আবার আপনি নতুন একটি গানে সুর তুলবেন অমৃতসুধার কোমলতা দিয়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আপনি হেরেই গেলেন পরম সত্য মৃত্যুর কাছে। এত মানুষকে আপনি এত আনন্দ দিয়েছেন, আজ সেই মানুষগুলো চোখের জলে আপনাকে বিদায় জানিয়ে শোকে স্তব্ধ। আজ আবারও প্রমাণিত হলো—‘ভালোবাসা যত বড় জীবন তত বড় নয়।’ আপনি যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন, শান্তিতে থাকুন।
n লেখক :কবি, শিশুসাহিত্যিক ও শিশুসংগঠক