এমন হত্যাকাণ্ড যেন আর একটাও না হয়

 ‘আমি সিনহা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে সন্তুষ্ট। প্রধানমন্ত্রী আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। সেনাপ্রধান, নৌবাহিনীর প্রধান খোঁজ-খবর নিয়েছেন। তারা ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। এই যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডটি ঘটল, এ ধরনের ঘটনা যেন আর না হয়। প্রত্যেক মায়ের প্রতিনিধি হয়ে বলব, এ ধরনের ঘটনা যেন আর না হয়। সবাই যেন সচেতন থাকেন।’

গতকাল সোমবার উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের নিজ বাসায় এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন টেকনাফে পুলিশের গুলিতে নিহত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের মা নাসিমা আক্তার। এর আগে নাসিমা আক্তারের সঙ্গে রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (রাওয়া) পক্ষ থেকে সংগঠনের চেয়ারম্যান মেজর (অব.) খন্দকার নুরুল আফসার, সেক্রেটারি জেনারেল লে. কর্নেল (অব.) এ এম  মোশারফ হোসেনসহ সাবেক সেনা কর্মকর্তারা সাক্ষাত্ করেন।

মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের মৃত্যুর ঘটনায় কক্সবাজার পুলিশ সুপার (এসপি) এ বি এম মাসুদ হোসেনের প্রত্যাহার চেয়েছেন রাওয়া চেয়ারম্যান মেজর (অব.) খন্দকার নুরুল আফসার। তিনি বলেন, ‘মেজর (অব.) সিনহা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে আমরা সন্তুষ্ট। তবে বিচারের প্রক্রিয়া       যাতে দ্রুত হয়, সেটি আমরা চাই। সিনহার ঘটনায় যারা কাস্টডিতে ছিলেন, তাদের জামিন হয়েছে। আমরা অত্যন্ত খুশি।’

সিনহার মা বলেন, ‘আমার ছেলে পজিটিভ ছিল। সাংবাদিকদের লেখা আমি পড়ছি। আমার হূদয়টা ছিড়ে যাচ্ছে। সিনহা যে মেজর, সেই পরিচয় কখনো দিতে চাইত না। তার যে ব্যবহার, তা দিয়েই সবকিছু করার চেষ্টা করত। আমার ছেলে দেশকে নিয়ে অনেক ভাবত। ছেলে আমাকে বলত, আমরা যদি দেশে ভালো কিছু রেখে যাই, তাহলে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম সেটা অনুসরণ করবে।’ ঘটনার রাতের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘সিনহা খুব স্পিডে গাড়ি চালাত। কাজ শেষে সাধারণত বাসায় ফিরত। সেদিন বাসায় ফিরছিল না, ফোনও ধরছিল না, ব্যাকও করছিল না। রাত ১২টা আনুমানিক। এক ভদ্রলোক ফোন করে বললেন, সিনহা আপনার কী হয়, কী করে? কয় ছেলেমেয়ে? উত্তর দিয়ে জানতে চাইলাম, এত প্রশ্ন করছেন কেন? আপনি কে? তখন তিনি বলেন, আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলছেন কেন? আমি টেকনাফ থানার ওসি। ভাবলাম, ছেলে তো স্পিডে গাড়ি চালায়, আবার কিছু হলো কিনা। বললাম, আমার ছেলে তো ফোন ধরছে না, ওকে একটু দেন। ফোনটা বাজতেছে কিন্তু ধরছে না। ওসি বলেন, হ্যাঁ, একটু দূরেই আছে। দেওয়া যাবে, বলেই রেখে দেন। কিন্তু এরপর বারবার ফোন দেই, আর কেউই ফোন ধরে না।’

রাওয়া চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা আশা করব তারা স্বচ্ছতা রক্ষা করবেন। কোনো পক্ষাবলম্বন করবেন না। হত্যার বিচার হলে সিনহার মা শান্তি পাবেন।’ ওসি প্রদীপ যেসব হত্যার সঙ্গে জড়িত, সেসব হত্যার বিচার করা হোক জানিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীকে সংস্কার করা হোক। এই ধরনের হত্যার যেন আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে। আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়। রাওয়া কর্তৃপক্ষ মেজর (অব.) সিনহার বিচারিক তদন্ত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে লে. জেনারেল (অব.) মইনুল ইসলামকে প্রধান করে একটি কমিটি করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে নিহত মেজর (অব.) সিনহার বড় বোন ও হত্যা মামলার বাদী শারমিন শাহরিয়া বলেন, ‘সিনহাকে আমি বলতাম, তুমি মানুষের হূদয়ের রাজপূত্র (প্রিন্স অব পিপলস হার্ট)। এটা সে প্রমাণ করেছে তার ভালো ব্যবহার আর গুণাবলি দিয়ে।’

অবসরপ্রাপ্ত মেজর খন্দকার নুরুল আফসার বলেন, ‘আজ সিনহার ব্যাপারে আমরা সোচ্চার হতে পেরেছি। এই ওসি প্রদীপ ১৪০টি মার্ডার করেছে, ওরা কোনো মুখ খুলতে পারছে না। তাদের পেছনে কেউ এগিয়ে আসছে না। আমরা চাই এমন সব কয়টি ঘটনার বিচার হোক। সিনহা হত্যা ছাড়াও প্রদীপ যে সমস্ত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, সেগুলোর বিচার হতে হবে।