একটি দেশে যখন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, তখন সেই দেশে স্বাভাবিকভাবে জ্বালানিচাহিদা বৃদ্ধি পায়। এই কারণে তৈল, বিদ্যুতের পাশাপাশি এই দেশে গ্যাসের চাহিদাও ক্রমবর্ধমান। সরকার এই চাহিদা পূরণে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহকে অনুত্সাহিত করিয়া বেসরকারি খাতে এলপিজি আমদানির উপর প্রাধান্য দিতেছে। আমাদের গ্রামগুলির দ্রুত রূপান্তর ঘটিতেছে। সেইখানে শহরের মতো নাগরিক সুযোগ-সুবিধার দ্বার উন্মোচিত হইতেছে। এই কারণে বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাহিদাও বাড়িতেছে। ফলে দেশ জুড়িয়া এলপি গ্যাসের বাজার এখন জমজমাট। ইহা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু যেইভাবে যত্রতত্র ও নিরাপত্তামূলক বিধান নিশ্চিত না করিয়া সিলিন্ডারে গ্যাস বিক্রয়ের ধুম পড়িয়াছে, তাহাতে অগ্নিকাণ্ডজনিত দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়িতেছে।
পত্রিকান্তরে প্রকাশ, বরগুনার আমতলী উপজেলায় অগ্নিনির্বাপক ও বিস্ফোরক লাইসেন্স ছাড়া লাইব্রেরি, চায়ের দোকান, কাপড়ের দোকান, মুদির দোকান, ক্রোকারিজ, ইলেকট্রনিকস ইত্যাদি দোকানসহ গ্রামের যত্রতত্র গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রয় হইতেছে। এমনকি ইহার বিক্রয়কেন্দ্র এখন সাইকেল গ্যারেজ, পানের দোকান, তুষ-কাঠের দোকান, রড-সিমেন্টের দোকান, ফ্ল্যাক্সিলোড-ফটোকপির দোকান ও সেলুনও। অনভিজ্ঞ, আনাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন এই সকল গ্যাসের দোকানের কারণে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িতেছে। প্রায়শ পত্রপত্রিকায় এইরূপ সিলিন্ডার হইতে দুর্ঘটনার খবর প্রকাশিত হইতে দেখা যায়। শুধু আমতলীতেই এইরূপ দুই শতাধিক বিভিন্ন দোকানে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রয় করা হইতেছে। ইহাতে সমগ্র দেশের চিত্রটি সম্যক উপলব্ধি করা যায়। এই সংক্রান্ত আরেকটি অভিযোগ হইল, সরকারনির্ধারিত মূল্যে গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রয় না করা। গত ২১ জুলাই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্যতালিকা নির্ধারণ করিয়া দেয়। ইহাতে দেখা যায়, ১২.৫ কেজি প্রতি গ্যাস সিলিন্ডারের বিক্রয়মূল্য ৬০০ টাকা। অথচ বাজারে বেক্সিমকো, ওমেরা, ওরিয়ন, সেনা কল্যাণ, লাফস, জি-গ্যাস, ফ্রেস, টোটাল, নাভানা, জেএমআই ও বিএম কোম্পানির গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রয় হইতেছে ৮০০ হইতে ৮৫০ টাকায়। ক্রেতাদের অভিযোগ, খুচরা বিক্রেতারা ইচ্ছামাফিক সিলিন্ডারের দাম হাঁকিতেছে। খুচরা বিক্রেতাদের জওয়াব, তাহারা ডিলারদের নিকট হইতেই অধিক মূল্যে ক্রয় করিতেছেন। আবার ডিলাররা বলিতেছেন, আমাদের দোষ কোথায়? সরকার গ্যাসের সিলিন্ডারের মূল্য হ্রাস করিলেও কোম্পানি তো হ্রাস করিতেছে না। এইখানে একে অপরের প্রতি ব্লেম গেম বা দোষারোপের খেলাই চলিতেছে।
সাধারণ মানুষ অধিক হারে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করিতেছে, যাহা আমাদের পরিবেশ রক্ষার জন্যও সহায়ক। তবে গ্যাস সিলিন্ডারের নিরাপত্তার ব্যাপারে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই সচেতন হইতে হইবে। ফায়ার সার্ভিস স্টেশন অফিসাররা বলিতেছেন, গ্যাসের ডিলারদের অগ্নিনির্বাপক লাইসেন্স দেওয়া রহিয়াছে। কিন্তু লাইব্রেরি, চায়ের দোকান, কাপড়ের দোকান, মুদি-মনিহারি ও ক্রোকারিজের দোকানে তো এই লাইসেন্স দেওয়া হয় নাই। এইভাবে গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি করা বেআইনি ও ঝুঁকিপূর্ণ। তবে বিস্ফোরক অধিদপ্তরকে দেখিতে হইবে, কীভাবে ইহার একটি সুষ্ঠু সমাধান করা যায়। সাধারণ মানুষের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে দোকানিদের প্রশিক্ষণ দিয়া এবং তাহাদের অফিস বা স্থাপনাগুলি অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিমুক্ত করিয়া সিলিন্ডার বিক্রয়ের অনুমতি প্রদান করা যাইতে পারে। আর তৃণমূল পর্যায়েও যাহাতে সরকারি মূল্যের সহিত বিক্রয়মূল্যের সমন্বয় থাকে, সেই ব্যাপারে মনিটরিংসহ দরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ।