আবারও আগস্ট, পিতা হারানোর শোকে আরো একবার শোকাতুর বাংলাদেশ। গানটা সারা বছরই কমবেশি বাজে বারবার, তবে আগস্টে বাজে অনেক বেশি। যতবারই শুনি, ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত... ...’—মনে হয় হতেও তো পারত। হওয়াটা খুব কি অসম্ভব ছিল? রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা তো আটকে দিতেও পারত ৩২-এর দিকে এগোতে থাকা কর্নেল ফারুকের ট্যাংকটিকে। তাদের মেশিনগানের গুলিতে তো ঝাঁজড়া হয়ে যেত পারত খুনি ফারুক। বঙ্গবন্ধুর ফোন পেয়েই যদি জেনারেল সফিউল্লাহ ৩২-এ পাঠিয়ে দিতেন দুই প্লাটুন কমান্ডো—শেখ কামাল হয়তো তখনো ৩২-এ থাকা সেন্ট্রিদের নিয়ে কোনো মতে ঠেকিয়ে রেখেছেন ঘাতক সেনাদের। তাদের সঙ্গে ৩২-এর পেছনের দেওয়াল টপকে হয়তো যোগ দিয়েছেন কর্নেল জামিলও। আর এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে কমান্ডোরাও। সামনে-পেছনে সাঁড়াশি আক্রমণে পর্যুদস্ত ঘাতকের দল। সূর্যের আলো ফুটতে ফুটতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। রাতভর গোলাগুলির শব্দে দিশেহারা নগরবাসী। ভোরবেলা বাংলাদেশ বেতারের ঘোষণায় জানতে পারল—ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে অভ্যুত্থানপ্রচেষ্টা! হামলাকারীদের হামলায় আহত চার জন সেনাসদস্য সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিত্সাধীন, তবে নিরাপদে আছেন বঙ্গবন্ধু আর তার পরিবারের সদস্যরা।
কিন্তু এ কল্পনা বাস্তবে রূপ নেয়নি। জুলসভার্নের সাইন্সফিকশনের বেশির ভাগই তো আজ বাস্তব। আমাদের নিজেদেরই আছে একাধিক সাবমেরিন। পৃথিবীর কক্ষপথে আবর্তিত হচ্ছে আমাদের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। কল্পনাতেই রয়ে গেছে শুধু জুলসভার্নের টাইম মেশিনটা। না হলে ইতিহাসের অঘটনগুলোকে শুদ্ধ করে ইতিহাসকে ইতিহাসের সঠিক পথে ঠিকই ফিরিয়ে আনা যেত। ধরুন ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানপ্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বয়সের কারণে দায়িত্ব থেকে অবসর নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। গত ১২টি বছর ধরে দক্ষতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করছেন তারই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা। জাতির পিতা জাতির অভিভাবক হিসেবে এখনো জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। আগামী বছর বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীকে সামনে রেখে প্রতীক্ষায় দিন গুনছে পুরোদেশ।
কথা ছিল মুজিববর্ষেই উদ্বোধন করা হবে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন সাগর সেতুটি। হয়নি—কোভিডের কারণে পিছিয়েছে কাজ। দেশে ফিরে গিয়েছিল প্রকল্পের বিদেশি কনসালটেন্টরা। এখন আবার ফিরতে শুরু করেছেন তারা। আশা করা হচ্ছে বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীতে উদ্বোধন করা যাবে স্বপ্নের এই সেতুটি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই যমুনা সেতুর পরিকল্পনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সরকার। আশির দশকের মাঝামাঝি উদ্বোধন করা হয়েছে যমুনার ওপর সড়ক ও রেল সেতু। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিত হয়েছিল যমুনা সেতু। তারপর বছর দশেক আগে মাওয়া আর আরিচা পয়েন্টে নির্মাণ করা হয়েছে জোড়া পদ্মা সেতু। এবারে যখন টেকনাফ-সেন্টমার্টিন সাগর সেতুর পরিকল্পনা করা হচ্ছিল তখন তাতে অর্থায়নের কথা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন-বিশ্বব্যাংক-এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের একটি কনসোর্টিয়ামের; কিন্তু শেষ মুহূর্তে কোনো কারণ ছাড়াই বেঁকে বসেছিল তারা। কারণটা অবশ্য দেশের মানুষ ভালোই জানে। তাতে অবশ্য পিছপা হননি শেখ হাসিনা। দেশীয় অর্থায়নেই এগিয়ে নিয়েছেন ‘টেকনাফ-সেন্টমার্টিন বঙ্গবন্ধু সাগর সেতু’র নির্মাণকাজ।
শুধু কি তাই? সুর্বণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ পরিণত হতে যাচ্ছে বিদ্যুত্ রপ্তানিকারক দেশে। এ বছরই বরিশালে স্থাপিত হয়েছে দেশের দ্বাদশ পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রটি। বাংলাদেশ এখন শতভাগ পারমাণবিক বিদ্যুিনর্ভর দেশ। তেল-কয়লা-গ্যাস পুড়িয়ে বিদ্যুত্ উত্পাদন এদেশে এখন ইতিহাসের বিষয়। সস্তা বিদ্যুত্ আর সস্তাশ্রমের হাতছানিতে এদেশে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আর সেই সঙ্গে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে উন্নয়নের সূচকগুলো। একবার যদি বিদ্যুত্ রপ্তানি শুরু হয়, তাহলে এদেশ যে কোথায় গিয়ে থামবে তা এক উপরওয়ালাই জানেন।
শুধু যে দেশের চেহারাই বদলে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু তাই নয়, একাত্তরের চেতনায়, রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন একটি সত্যিকারের অসম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে। এদেশে সত্যি সত্যিই ‘ধর্ম যার যার; কিন্তু উত্সব সবার’। এনিয়ে টিভির টকশোতে মাত্রই তুমুল আলোচনা হলো। টকশো শেষে বেরিয়ে আসতে আসতে সেসব নিয়েই গল্প করছিলেন ‘সম্প্রীতিবিশ্ব’র আহ্বায়ক নাট্য ব্যক্তিত্ব পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। ৭১-এর চেতনায় একটি অসম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করায় বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ এখন সারা পৃথিবীতে রোল মডেল। বাংলাদেশে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির উদাহরণ বিশ্বের দেশে দেশে ছড়িয়ে দিতে সম্প্রীতিবিশ্ব নিয়ে কাজ করছেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়রা। সামনেই রোহিঙ্গাদের বিষয়ে কথা বলতে চীনে যাচ্ছেন তিনি। দৌড়াদৌড়ির শেষ নেই তার।
আলোচনায় ছেদ টেনে একসময় বাড়ির পথ ধরেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। কল্পনায় ছেদ টানার পালা এবার আমারও। পিতা হারানোর শোকে ভারাক্রান্ত যখন হূদয়, কী হতে পারত আর কী হলো না, সেই হিসাব কষতে গিয়ে পাওয়া না পাওয়ার বিশাল ব্যবধানে বিষণ্ন এখন মন। তারপর এক সময় নিজেকেই প্রবোধ দেই, হতে তো পারত আরো খারাপ। বঙ্গবন্ধু নেই কিন্তু হালটা তো নেত্রীর হাতেই। তাই বা কম কীসে?
n লেখক :চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
ও সদস্যসচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ