কুমিল্লায় ‘নকল আসামির’ হাজতবাস, তদন্ত কমিটি মাঠে

কুমিল্লায় একটি মাদক মামলায় ‘আসল আসামি’ আনোয়ার হোসেনের পরিবর্তে টাকার বিনিময়ে ‘নকল আসামি’ আবু হানিফের হাজতবাসের ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। কুমিল্লা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. আরিফুল ইসলাম সরদারকে আহবায়ক করে এ কমিটি গঠন করা হয়।

কমিটির অপর সদস্যরা হচ্ছেন- অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোহাম্মদ শাহরিয়ার মিয়াজী ও কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শাহজাহান আহমেদ। মঙ্গলবার বিকালে গঠিত এ কমিটিকে ৩ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর।

আজ বুধবার কমিটির সদস্যরা তদন্তে মাঠে নেমেছে। বুধবার সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। গত সোমবার আসামির জামিন শুনানিকালে বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হলে মামলার জামিন শুনানি মুলতবী করা হয়েছিল। 

যেভাবে ঘটে আসল-নকল আসামি প্রতারণা:
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৯ সালের ৩০ জুলাই কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার আড়াইওরা এলাকা থেকে গাঁজা উদ্ধারের ঘটনায় দুইজনকে আসামি করে কোতয়ালী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) এসআই নন্দন চন্দ্র সরকার। এ মামলায় হেলাল মিয়া নামে এক মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার হলেও পলাতক ছিলেন জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শশীদল ইউনিয়নের গঙ্গানগর গ্রামের মৃত তৈয়ব আলীর ছেলে মো. আনোয়ার হোসেন। মামলাটির তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে ওই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. সহিদুল ইসলাম পিপিএম। এ মামলায় চলতি বছরের গত ২৬ জুলাই আনোয়ার হোসেন পরিচয়ে আবু হানিফ আদালতে হাজির হয়ে জামিন চাইলে বিচারক আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণ করেন। এদিকে এ মামলায় কারাগারে যাওয়া যে ব্যক্তি আনোয়ার হোসেন পরিচয়ে আত্মসমর্পন করেছেন প্রকৃতপক্ষে তিনি জেলার বরুড়া উপজেলার বড় হাঙ্গিনা গ্রামের মৃত মনু মিয়ার ছেলে মো. আবু হানিফ।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, আবু হানিফ গত বছরের ২২ ডিসেম্বর ২৪ কেজি গাঁজা পাচারকালে বিজিবি’র হাতে গ্রেফতার হন। এ ঘটনায় ৬০ বিজিবি’র অধীন সালদানদী বিওপি’র নায়েক মো. খোরশেদ আলম বাদী হয়ে ব্রাহ্মণপাড়া থানায় মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় পরদিন (২৩ ডিসেম্বর) আবু হানিফ আদালতের মাধ্যমে কারাগারে যান। পরে চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি তিনি জামিনে মুক্ত হন। এ মামলায় আবু হানিফের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন ব্রাহ্মণপাড়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা। কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. শাহজাহান আহমেদ জানান, ‘বিষয়টি নজরে আসার পর জানতে পারি দুটি মামলায় একই ব্যক্তি কারাগারে এসেছেন। রেজিস্ট্রারে আনোয়ার হোসেনের বয়স ৪২ বছর এবং আবু হানিফের বয়স ২২ বছর উল্লেখ রয়েছে। নাম ও বয়সে পার্থক্য থাকলেও ছবিতে মিল রয়েছে। পরে কারাগারে থাকা আসামির সাথে কথা বলে সত্যতা পাওয়া যায়। বিষয়টি লিখিতভাবে কুমিল্লা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও সংশ্লিষ্ট আদালতকে অবহিত করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আসামি আবু হানিফের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছি যে, ৫০ হাজার টাকা চুক্তির মধ্যে তাকে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে এবং ৪০ হাজার টাকা পরে দেওয়া হবে এমন চুক্তিতেই সে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে আনোয়ার হোসেন পরিচয়ে কারাগারে এসেছে।’ 

এ বিষয়ে জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. জহিরুল ইসলাম সেলিম সাংবাদিকদের জানান, ‘মামলার মূল আসামি হচ্ছে আনোয়ার হোসেন। কিন্তু তার পরিবর্তে আদালতে আত্মসমর্পন করেছে আবু হানিফ। এরপর নিয়মানুযায়ী মামলার শুনানী শেষে তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে প্রেরণ করেছে। একজন ব্যক্তিকে প্রলোভন দেখিয়ে বা অন্যকোনভাবে ম্যানেজ করে আবু হানিফকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে- যা সম্পূর্ণ বেআইনী ও প্রতারণার শামিল। কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর সাংবাদিকদের জানান, ‘কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শাহজাহান আহমেদ স্বাক্ষরিত এক পত্রের মাধ্যমে বিষয়টি জেনেছি। এ বিষয়ে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুল ইসলামকে আহবায়ক করে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ৩ কার্যদিবসের মধ্যেই তাদেরকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ইত্তেফাক/এএম