কোভিড-১৯ (নোভেল করোনা ভাইরাস) বিশ্ব জুড়ে বর্তমানে এক ত্রাসের নাম। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালির মতো উন্নত দেশগুলোতে পর্যন্ত করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে নেমে এসেছে স্থবিরতা। সারা বিশ্বেই চলছে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় নানান গবেষণা। এ পর্যন্ত পরীক্ষিত সংক্রমণ কমানোর সর্বাপেক্ষা কার্যকর পদ্ধতি হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণ। আর তাই বিশ্ব জুড়ে নানান কর্মসূচি ঘোষিত হয়েছে এই দূরত্ব নিশ্চিত করতে। বিভিন্ন দেশে সূচিত হয়েছে লকডাউন। বাংলাদেশে ৮ মার্চ প্রথম কোভিড-১৯ সংক্রমিত রোগী ধরা পড়ার পরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণসহ ব্যাপক সচেতনতামূলক ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি গৃহীত হয়। সারা দেশের মতো খুলনায়ও এসব কর্মসূচি সমানতালে চলমান রয়েছে। ম্যানেজমেন্ট, মনিটরিং, কো-অর্ডিনেশন ও ইনোভেশন—এই চতুর্মাত্রিক কার্যক্রমের মাধ্যমে খুলনা জেলা প্রশাসন করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও চালিয়ে যাচ্ছে বিপুল কর্মযজ্ঞ। এক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে বিভিন্ন ডিজিটাল অ্যাপ ও সফটওয়্যারভিত্তিক উদ্ভাবনী উদ্যোগসমূহ ইতিমধ্যে সারা দেশে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। জেলা প্রশাসক হেলালউদ্দিন খানও অনেকগুলো অভিনব উদ্যোগ নিয়েছেন।
বেসরকারি মানবিক সহায়তা সেল গঠন ও ‘D2DK’ ডিজিটাল অ্যাপভিত্তিক ব্যবস্থাপনা :উদ্ভূত করোনা পরিস্থিতিতে ত্রাণসহায়তা পাওয়ার যোগ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নেই এক বিশাল জনগোষ্ঠী, যারা কিনা ভাসমান জনগোষ্ঠী। বিশেষত তৃতীয় বৃহত্তম শিল্পনগরী খুলনায় এই জনগোষ্ঠী নেহাতই কম নয়। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে অনেকেই বসবাস করছে এই মহানগরে, যারা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হয়ে পড়েছে কর্মহীন। লকডাউন চলমান থাকায় তারা জীবিকার জন্য অন্য কোথাও যেতে পারছে না। আবার নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগণ যারা ত্রাণের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে চাইতে সংকোচ বোধ করে, এ ধরনের বিপুল জনগোষ্ঠীর প্রতি মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়াও প্রশাসনের দায়িত্ব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই জনগোষ্ঠীর জন্য অগ্রাধিকার তালিকা প্রস্তুত করার নির্দেশনা প্রদান করেন। আর খুলনা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এ ধরনের জনগোষ্ঠীকে খাদ্যসহায়তা পৌঁছে দেওয়ার নিমিত্তে পূর্বেই গঠিত হয় ‘বেসরকারি মানবিক সহায়তা সেল’ এবং সূচনা হয়েছে ‘D2DK’ অ্যাপের, যার মাধ্যমে সাহায্যপ্রার্থীরা আবেদন করতে পারছেন। আর ডিজিটাল ডাটাবেজের মাধ্যমে তাদের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রায় চলমান রয়েছে ‘Door to Door Essential Goods Distribution in Corona Crisis through Digital Survey.’
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও ‘জরুরি চিকিত্সাসেবা খুলনা’ অ্যাপ :খুলনা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং খুলনা শিশু হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় ‘Providing Home to Home Emergency Medical Services in Corona Crisis through Digital System’ কার্যক্রমের আওতায় ‘জরুরি চিকিত্সাসেবা খুলনা’ অ্যাপের মাধ্যমে সেন্ট্রাল সার্ভারে ডাটাবেইজ তৈরি করা হচ্ছে। খুলনা শিশু হাসপাতালের সম্মেলনকক্ষে একটি ডিজিটাল কন্ট্রোলরুম স্থাপন করা হয়েছে। চিকিত্সক, নার্স ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত রাখতে রোস্টার তৈরি করা হয়েছে। মোবাইল ফোনে কল করলে ফোনেই প্রয়োজনীয় চিকিত্সার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এসএমএস বা ইমেইল পেলে সেবাপ্রত্যাশীকে নির্ধারিত নম্বর থেকে ফোনকল করা হয় এবং প্রয়োজনীয় চিকিত্সাসেবা প্রদান করা হয়েছে।
‘হাতের মুঠোয় কাঁচাবাজার’ ডিজিটাল অ্যাপভিত্তিক কৃষি ও পোলট্রি ব্যবস্থাপনা :করোনা পরিস্থিতির কারণে দেশব্যাপী লকডাউনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রান্তিক কৃষক, পোলট্রি ও ডেইরি খামারিদের উত্পাদিত পণ্য সুষ্ঠুভাবে বাজারজাতকরণ এবং লকডাউনের কারণে ঘরে অবস্থানরত ক্রেতাসাধারণের কাছে ন্যায্যমূল্যে এসব পণ্য পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল উপায়ে স্বচ্ছ ও সহজতর করতে সৃষ্টি করা হয়েছে মোবাইল অ্যাপ :‘হাতের মুঠোয় কাঁচাবাজার’। এই অ্যাপের মাধ্যমে ‘ঘরে বসে কৃষিবাজার’ ও ‘ডিজিটাল সুন্দরবন প্রোটিন হাউজ’ নামক দুটি কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। ‘ঘরে বসে কৃষিবাজার করি’ কার্যক্রমের আওতায় কৃষিপণ্য যেমন :শাকসবজি, কাঁচা তরিতরকারি, ফলমূল ইত্যাদি প্রান্তিক কৃষকের কাছ থেকে কিনে ন্যায্যমূল্যে ঘরে ঘরে ক্রেতাসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
‘ডিজিটাল সুন্দরবন প্রোটিন হাউজ’ কার্যক্রমের আওতায় আমিষজাতীয় পণ্য যেমন :ডিম, দুধ ইত্যাদি প্রান্তিক কৃষকের কাছ থেকে কিনে ন্যায্যমূল্যে ঘরে ঘরে ক্রেতাসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে খুলনা জেলা প্রশাসনকে সহযোগিতা করছে জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস, খুলনা ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, খুলনা।
‘কৃষকের হাসি’ ডিজিটাল অ্যাপভিত্তিক কৃষকের নিকট থেকে ধান ক্রয় কার্যক্রম :জেলা প্রশাসন, খুলনার উদ্যোগে সূচনা করেছে ‘কৃষকের হাসি’ নামক ডিজিটাল অ্যাপ, যার মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গৃহীত এই কার্যক্রম সমন্বয় করছে জেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রণ অফিস।
‘ডিজিটাল রাইস প্রকিউরমেন্ট’ অ্যাপ :ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ যথাযথ বাস্তবায়নে এবং উদ্ভূত করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ন্যায় দুর্যোগ পরিস্থিতিতে সরকারের চাল সংগ্রহ কার্যক্রমকে একটি ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমে সমন্বয় করা এবং স্বচ্ছ ও সহজতর আর্থিক লেনদেন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন, খুলনার উদ্যোগে চালু হয়েছে ‘ডিজিটাল রাইস প্রকিউরমেন্ট’ অ্যাপ।
জলা প্রশাসন, খুলনা তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য ভিডিও কনটেন্টে ক্লাসগুলো ধারণ করে ইউটিউব ও ফেইসবুকে প্রচারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যাতে করে করোনা ভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্কুল বন্ধ হলেও শিক্ষার্থীদের কোনো ক্ষতি না হয়। তারা যেন বাসায় বসেই নিজে নিজে কিংবা অভিভাবকদের সহযোগিতা নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারে। উদ্ভূত করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে শিক্ষাব্যবস্থার টেকসই সমন্বয় সাধন ও শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এহেন জনহিতকর উদ্যোগ সমগ্র দেশে অনুকরণ করা যেতে পারে। উদ্ভূত করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে ঘরে ঘরে জনগণকে প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার নিমিত্তে জেলা প্রশাসন, খুলনার উদ্যোগে গৃহীত হয়েছে 'Home Delivery of Medicine & Medical Products in Corona Crisis through Mobile Apps' কার্যক্রম এবং এর আওতায় সূচনা করেছে ‘Online Medicine Mart Khulna’ মোবাইল অ্যাপ। এর মাধ্যমে নির্ধারিত নীতিমালার সাপেক্ষে প্রেস্ক্রিপশনের সফট কপি আপ্লোডের ভিত্তিতে এবং টেকনিক্যাল কমিটির পরামর্শের পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের চাহিদা মোতাবেক প্রয়োজনীয় ওষুধ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার অনন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসন, খুলনা।
n লেখক :সিনিয়র সাংবাদিক