দুঃখ নিয়েই আমরা তাঁকে ভালোবাসব

১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়। একটি দেশের স্বাধীনতা অর্জনে যিনি প্রধান নেতা থাকেন, তাঁকে বলা হয় জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের প্রধান নেতা। এজন্য তাঁকে বাংলাদেশের জাতির পিতা বলা হয়। আমরা তাঁকে বলি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আমাদের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়। এই যুদ্ধ হলো মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সারাদেশের স্কুল, কলেজ, রাস্তাঘাট, অফিস প্রভৃতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু এই ধ্বংসের মধ্য থেকে দেশটাকে গড়ে তুলছিলেন। কিন্তু তিনি সময় পেয়েছিলেন মাত্র সাড়ে তিন বছর। ১৯৭৫ সালের পনেরোই আগস্ট কিছু ক্ষমতালোভী দুর্বৃত্ত তাঁকে হত্যা করে। বাঙালি হারায় তার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে। পনেরোই আগস্ট তাই জাতীয় শোক দিবস।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু ছিলেন দেশের প্রেসিডেন্ট। কিন্তু তিনি থাকতেন সাধারণ মানুষের মতো। প্রেসিডেন্টের জন্য যে বিরাট সরকারি বাড়ি থাকে, সেখানে তিনি থাকতেন না। তিনি থাকতেন ঢাকার ধানমন্ডিতে, নিজের বাড়িতে। বাড়িটা ছিল খুব সাধারণ একটি দোতলা বাড়ি। ঢাকা শহরে তখন এরচেয়ে অনেক ভালো ভালো বাড়ি ছিল। এই বাড়িতে তিনি সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। আমরা যেমন মা-বাবা, ভাই-বোন সকলের সঙ্গে একত্রে বাড়িতে থাকি, তিনিও সেভাবে থাকতেন। সে বাড়িতে গ্রাম থেকে আত্মীয়-স্বজনেরাও বেড়াতে আসতেন।

বঙ্গবন্ধুর জীবনযাপন ছিল খুব সাধারণ। তাঁর বাড়ির দারোয়ান, কাজের লোক প্রভৃতির সাথেও তিনি গল্প করতেন। বাড়ির এককোণে ছিল একটি কবুতরের ছোট ঘর, সেখানে বাকবাকুম করে কবুতর ডাকত। বঙ্গবন্ধুর ছোট ছেলের নাম শেখ রাসেল, তার বয়স তখন দশ বছরও হয়নি। সেও কবুতরের সাথে খেলা করত। বাড়ির মধ্যে বেশকিছু গাছ ছিল—ফলের গাছ, ফুলের গাছ। বাড়ির সামনে একটি ছোট রাস্তা, রাস্তার একপাশে ছিল একটি জলাশয়। শহরের বাড়ি হলেও গ্রামীণ গৃহস্থের মতো ছিল তাঁর বাড়ির পরিবেশ। সেখানে বৈঠকখানা ছিল, আলাদা রান্নাঘর ছিল, ছিল উঠানও। বাড়িতে গান-বাজনা হতো, ছিল খেলাধুলার সরঞ্জামও। রাসেল তখন স্কুলের ছাত্র, স্কুল থেকে ফিরে সেও হোমওয়ার্ক করত। বৈঠকখানায় পৃথিবীর নানা দেশ থেকে মানুষ আসতেন বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে। কত হাজার মানুষ যে তাঁর বাড়ির রান্নাঘরের ভাত খেয়েছে! তাঁর পরিবারটি ছিল যেন বাঙালির কোটি পরিবারের একটি চমত্কার প্রতিচ্ছবি।

অসাধারণ এই পরিবারটিকে ১৯৭৫ সালের পনেরোই আগস্ট একদল দুর্বৃত্ত অস্ত্র হাতে আক্রমণ করে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সবাইকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, কেউ তাঁকে হত্যা করতে পারে না। এজন্য তাঁর বাড়িতে ভালো নিরাপত্তার ব্যবস্থাও ছিল না। তাঁর সেই বিশ্বাস ভঙ্গ করে সেনাবাহিনীর একদল বিপদগামী সদস্য তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সবাইকে হত্যা করে। বাংলাদেশ হারায় তার মহান জাতির পিতাকে। এ নিমর্মতার স্মৃতি আমরা কখনো ভুলতে পারব না।

বঙ্গবন্ধুকে যারা হত্যা করেছিল, বিচারে তাদের ফাঁসি হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হারানোর ব্যথা আমরা আজও অনুভব করি। তাঁকে হারানোর বেদনা যুগযুগান্ত ধরে আমাদের দুঃখ দেবে। এই দুঃখ নিয়েই আমরা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসব। কারণ, বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসলে বাংলাদেশকেই ভালোবাসা হয়।

শিল্পী :শাহাবুদ্দিন আহমেদ