যখন প্রায় ধরে নেওয়া হচ্ছিল অস্ট্রেলিয়া সম্ভবত কোভিডের থাবা থেকে বের হয়ে যাচ্ছে, তখনই সব হিসাব উলটে দিয়েছে মেলবোর্ন তথা ভিক্টোরিয়া। সেখানে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা জরিমানার পরিমাণ দেখলেই বোঝা যাবে। এ লেখা যখন লিখছি তখন বিনা প্রয়োজনে বাইরে গেলে, ধরা পড়লে সেখানে ৫ হাজার ডলার জরিমানা দিতে হবে। বাংলাদেশি টাকায় যা ৩ লাখ টাকার সমান। যারা কোনো ধরনের লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও কাজে যাবেন তাদের জন্য আরো কঠিন ব্যবস্থা। তাদের ২০ হাজার ডলার জরিমানাসহ হাজতবাসেরও ভয় আছে। এখানে একটা কথা বলা দরকার। আমাদের দেশে সরকার বা প্রশাসন এমন নিষেধাজ্ঞা কিংবা আইনের আদেশ দিয়েই খালাস। তারা লোকজন কীভাবে বাঁচবেন, কী খাবেন বা কীভাবে চলবেন—সে বিষয়ে কিছু বলেন না; কিন্তু এদেশে তো তা চলে না। তাই ভিক্টোরিয়া তথা মেলবোর্নের মুখ্যমন্ত্রী এন্ড্রু এও ঘোষণা দিয়েছেন, যারা করোনা বা কোভিডের কারণে কাজে যাবেন না, যেতে পারবেন না, তাদের চলার মতো ডলার দেওয়া হবে। আর তা প্রতি ১৫ দিনে পৌঁছে যাবে যার যার অ্যাকাউন্টে।
কিন্তু এগুলো সাময়িক সমাধান। মূল বিষয় হলো, করোনার এই আক্রমণ ফিরে এলো কীভাবে? মেলবোর্নের ঘটনা আমাদের দেশের জন্যও বড় উদাহরণ বইকি। বিদেশ-প্রত্যাগত যাদের কোয়ারেন্টাইনে হোটেলে রাখা হয়েছিল তারা কী করেছে? উেকাচ দিয়ে সিকিউরিটি গার্ডদের বশ করে রাতে বের হয়ে গিয়েছিল হোটেল থেকে। এমনও জানা গেছে, এজন্য তারা শারীরিক সম্পর্ক করতেও পিছপা হয় নি। বলা বাহুল্য, বহুজাতিক এই দেশে সবাই নামে অস্ট্রেলিয়ান হলেও সবারই আছে নিজস্ব জন্ম ও দেশ-পরিচয়। জানা গেছে, ঐসব সিকিউরিটি গার্ডের বেশির ভাগই ছিল মধ্যপ্রাচ্যের লোক। এই হঠকারিতা আজ এই দেশ ও জাতিকে ফেলেছে ঘোর বিপদে। লক্ষনীয়, আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের একাংশ যেমন নিয়ম মানতে নারাজ, তাদের কিছুতেই বাগে আনা যায় না—এখানেও তাই। করোনার মতো ভয়াবহ রোগ মহামারির সময়ও এমন আচরণ সভ্যতাকে ফেলেছে ঘোর বিপদে।
করোনার পর থেকে এখানে মন্ত্রীদের ঘুম হারাম। নিয়ম না মানার কারণে মন্ত্রিত্ব হারানোর ঘটনাও ঘটেছে এদেশে। এ সততার ভেতরেই আছে সমাধান। মেলবোর্ন এই সেদিনও দুনিয়ার বসবাসযোগ্য শহরের শীর্ষে ছিল। সবকিছু মিলিয়ে বসবাসের জন্য ভালো শহরের তালিকায় থাকা এই নগরী এখন ভূতুড়ে।
আমি সব সময় বলি, অভিবাসন নিয়ে অস্ট্রেলিয়া এসেছি। শুধু সিডনিতে থাকতে তো আসি নি। শেকড় প্রোথিত হয়ে গেছে বলে যেতে পারি নি; কিন্তু এখনো মনে মনে ভাবি—একবার হলেও থাকতে হবে সেখানে। জীবনানন্দের ট্রাম এখন খুব বেশি দেশ বা শহরে দেখা যায় না। আধুনিকতার নামে সিডনিতে যেসব লাইট রেল ঘুরে বেড়ায় তাদের ট্রাম বললেও আমার মনে হয় মূল ট্রামের সত্ ভাই বা বোন। কলকাতা প্যারিস এমন কিছু শহরের পাশাপাশি মেলবোর্নের সবুজ ঘেরা পথ দিয়ে বুক চিরে ঠন ঠন শব্দ তুলে যাওয়া ট্রাম মনে করিয়ে দেয় ঐতিহ্য।
বেশ অনেক বার গিয়েছি সেই শহরে। সবসময় মনে হয়েছে প্রাণবন্ত আর ধ্রুপদী শহর। রাতে শহর ঘুরে না দেখলে কখনো তাকে চেনা যায় না। সিডনিতে কোনো বইয়ের দোকান বিকালের পর খোলা থাকবে এটা ভাবাও যায় না। ওখানে দেখলাম রাত এগারটায় পুরোনো বইয়ের দোকানে চলছে কেনাকাটা। হবারই কথা। সিডনিতে অলিম্পিক হয়েছিল ২০০০ সালে। কমনওয়েলথ গেমস থেকে সিনেমার উত্সবে এগিয়ে থাকা এই শহরে দুই বার হয়েছে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনাল।
সেই ঐতিহাসিক নয়ন জুড়ানো মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড এক অসাধারণ জাদুঘরও বটে। ভেতরে সাজানো শত শত বর্ষের তথ্য বাঘা বাঘা ক্রিকেটারদের বিশাল বিশাল কাট-আউট মনে করিয়ে দেয় কাকে বলে ইতিহাস। যত্নে রক্ষিত আছেন শচিন ইমরানসহ এশিয়ান তারকারাও। এই মাঠে দেখতে গিয়েছিলাম আমার স্বপ্নের খেলোয়াড় মেসিকে। আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিলের সে খেলায় এক গোলে জিতেছিল ওরা। এই মাঠে আমি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জয়পরাজয় দেখতে গিয়েছি অনেক বার।
পুরো শহরটি তার নামের মতো ভিক্টোরিয়ান। ঐতিহ্য আর আধুনিকতায় মোড়ানো শহরের মূল রেল স্টেশনটি দেখলে চমকেযেতে হয়। ফিন্ডারস স্ট্রিট নামের এই স্টেশনটি অবিকল হাওড়ার মতো। গল্প আছে—বৃটিশ আমলে সেখান থেকে পাঠানো নকশা অদলবদল হয়ে যাওয়ায় নাকি এই সাযুজ্য।
এত কথা লেখার কারণ একটাই। এই নান্দনিক শিল্প সংস্কৃতির শহরটি আজ বড় বিপদে। মার্চ মাসেও যা হয়নি এপ্রিলে যা লাগে নি, এখন সে কঠোর নিয়ম চাপানো হয়েছে এখানে। সবচেয়ে কড়া নজরদারি তো বটেই রাতে শুরু হয়েছে কারফিউ। অভাবিত অবাঞ্ছিত কারফিউর নাম এখানে সচরাচর শোনে নি কেউ।
এই নন্দনকানন সদৃশ শহরটিতে আবার শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরে আসুক। মন থেকে চাই। মানুষ বড় অসহায় আজ সব দেশে সব শহরে।
n লেখক :সিডনি প্রবাসী