বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে

আমাদের জাতীয় সংবিধানটির প্রথম কপি হাতে লিখে, ছবি এঁকে তৈরি করা হয়েছিল। সেই কাজ করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দুইবার দেখা হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে ফিরে এসে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানটা তৈরি করলেন। আমি তো কিছু জানতাম না। তখন আমার বাসায় টেলিফোন ছিল না। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন স্যার একজনকে দিয়ে আমাকে জরুরি খবর দিলেন, তাঁর বাসায় যাওয়ার জন্য। যাওয়ার পর তিনি বললেন, আগামী কাল সকালে আমরা প্রধারমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করব। তখন আবেদিন স্যারের টেবিলে দেখি একটা ভারতীয় সংবিধান। স্যার বলেন, ‘এইটা দেখ, এটার তত্ত্বাবধানে ছিলেন শিল্পী নন্দলাল বসু’। সেটা উল্টেপাল্টে দেখলাম। বেশ সুন্দর। কিছু ছবি আছে, নকশা আছে। দেখার পর বললেন, আমাদের বাংলাদেশের সংবিধানেরও এরকম একটা কিছু চান বঙ্গবন্ধু। ড. কামাল হোসেন এসেছিলেন (তখন আইন মন্ত্রী), আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। তুমি কালকে বাসায় চলে এসো, একসঙ্গে চলে যাব। পরের দিন বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলাম। তখন গণভবন হচ্ছে ইস্কাটন। ঠিক সময়েই আমরা গিয়ে হাজির হলাম। বঙ্গবন্ধু আমাদের দেখে চেয়ার থেকে উঠে আসলেন। ঘরের মাঝামাঝি এসে তিনি আবেদিন স্যারকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আবেদিন ভাই আপনি এসেছেন।’ তারপর বললেন, আপনি বেঁচে আছেন, আমিও বেঁচে আছি, আমাদের স্বাধীনতার জন্য ৩০ লক্ষ লোক প্রাণ দিয়েছে। দেশের মানুষের ওপর দিয়ে অনেক যন্ত্রণা-নির্যাতন গেল। এখন জানি না দেশটা কী করে চালাব। আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন।

সবাই বসলাম। সেখানে দেখলাম আরো অনেক দেশের প্রিন্টেড সংবিধান। আমেরিকা ও অন্যান্য দেশের সংবিধান ছিল ছোট আকারের। একমাত্র ভারতীয় সংবিধানটিই ছিল বড়ো, বই নকশা পরিপাটি ও সুন্দর মুদ্রণ, ইংরেজিতে লেখা। হিন্দি ভাষায়ও একটা আছে। তারপর সাধারণ খোঁজ-খবর এবং কুশল বিনিময় করলেন। আবেদিন স্যার আমাকে দেখিয়ে বললেন, ওর নাম হাশেম খান। ও আমাদের চারুকলায় শিক্ষকতা করছে। ও ডিজাইন, নকশা, ছাপা খুব ভালো বোঝে। বিশেষ করে প্রেসের ব্যপারটা খুব ভালো বোঝে। কথা ঠিক শেষ হওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আবেদিন ভাই আপনি একটু থামেন। ওর পরিচয়টা আপনি আমার কাছ থেকে নেন।’ আমি বিস্মিত হলাম। তারপর বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘ও আমার ছয় দফার লোগো করেছিল। ছয় দফার যে বই সেটার প্রচ্ছদ করেছিল এবং যে মঞ্চ থেকে আমি ছয় দফা ঘোষণা করলাম সেই মঞ্চসজ্জা ওর করা।’ সেখানে আওয়ামী লীগের গণ্যমান্য বয়স্ক নেতারা ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন ফজলুল হক মনি। সে ছিল আমার বন্ধু। সে বলল, মামা, হাশেম খান তো ছয় দফার চমত্কার একটা ব্যাখ্যা দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু বললেন, কী ব্যাখ্যা বল তো। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, ছয় দফা আপনার রাজনৈতিক চিন্তা অবশ্যই যথাযথ। ছয় দফা বাঙালির মুক্তির সনদ, ছয়টি নীতি। কিন্তু এই ছয় সংখ্যাটি বাঙালির জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এই ছয়টি সংখ্যা হচ্ছে বাংলাদেশের ষড়ঋতুও। বাংলাদেশের মানুষের জীবন আবর্তিত হয় এই ছয় ঋতুর মাধ্যমে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এখানকার মানুষ একটি বছর ছয় ভাগে ভাগ করে নেয়। ছয় ঋতুর ওপর নির্ভর করে এই দেশের মানুষ হাজার বছর ধরে চলছে। আমার কথা শুনে বঙ্গবন্ধু সবার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। বললেন, ছয় দফা ঘোষণা মঞ্চের সজ্জা ছিল ছয়টি জ্যামিতিক আকৃতির। সেটা দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। এখন ওর এই ব্যাখ্যা আমার খুব ভালো লাগল। আমি তো সত্যি সত্যি রাজনৈতিক মুক্তির কথা বলেছি। রাজনৈতিক আন্দোলনের কথা বলেছি। এই ছয়টি সংখ্যা নিয়ে এই দেশের মানুষ হাজার বছর ধরে এগিয়ে চলেছে, সে কথা আগে ভাবিনি। আবেদিন ভাই, আপনি যথাযথ মানুষটিকে নিয়ে এসেছেন। আমার আর কোন চিন্তা নাই।’ আমার ব্যাখ্যাটি তিনি ভালোভাবে গ্রহণ করেছিলেন।

একটা কথা বলে রাখি, ১৯৬৬ সালে ছয় দফার ডিজাইন দেখাতে গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর কাছে। তখন বঙ্গবন্ধু সেটা দেখে সবাইকে বললেন, কেমন হয়েছে। সেখানে যারা ছিলেন কেউ কিছু বললেন না। তিনি বললেন, আমার খুব ভালো লেগেছে। তখন আমার মনে হলো আমার বুকের ওপর থেকে যেন কয়েক শত মন ওজনের পাথর সরে গেল। আমি ভয়ে ভয়ে ছিলাম এই আধুনিক জ্যামিতিক নকশা তাঁর ভালো লাগবে কি না। দেখলাম তিনি খুব সন্তুষ্ট। ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদক সাহেব তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া তখন সেখানে ছিলেন। মানিক মিয়াকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করে বললেন, যেদিন আমি ছয় দফা ঘোষণা করব সেদিন ইত্তেফাকে বিশেষ সংখ্যা বের হবে। পুরো প্রচ্ছদে এই ছবিটি ছাপতে হবে, প্রচ্ছদে আর কোনো কিছু ছাপা হবে না। এই নকশাটা রঙিন ছাপতে হবে। সম্পাদক সাহেব বলেছিলেন, আমাদের তো ছয় রঙের প্রচ্ছদ ছাপা সম্ভব হবে না। তখন এক রঙে পত্রিকা ছাপা হয়। তিনি বললেন, বড়োজোর আমরা দুই রং করতে পারি। তখন বঙ্গবন্ধু বললেন, আমি এগুলো জানি না। তখন আমি বললাম, ছয় রংই করা যাবে, তবে সময় লাগবে। ছয় রঙের জন্য ছয়বার ছাপতে হবে। মানিক মিয়া সাহেব বললেন, এটা একটা অসম্ভব কাজ হবে, আমি যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করব। ছয় দফা ঘোষণার দিন সেটা ছয় রঙেই ছেপেছিলেন। সেদিনের ইত্তেফাক যদি কেউ দেখেন। সেই দিনের কপিটি আমরা নগর জাদুঘরে রেখেছি। সেদিন পত্রিকাটির প্রথম পৃষ্ঠায় আর কিছুই ছাপা হয়নি। শুধুই ছয় দফার নকশাটি পুরো পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছিল। যখন আমি মঞ্চসজ্জা করি, তখন আমি একটি স্লোগান লিখে দিয়েছিলাম। ‘৬ দফা বাঙালির বাঁচার দাবি’। এই স্লোগানটিই বঙ্গবন্ধু গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। ৬ দফা ঘোষণা অনুষ্ঠানের মঞ্চের পেছনের লেখাগুলো আমার হাতে লেখা।         

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আবার দেখা হয় সংবিধানের কাজ শেষ হওয়ার পর। সংবিধান বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে গেলাম। আবেদিন স্যারসহ আমরা সকল শিল্পী ছিলাম। ড. কামাল হোসেন সাহেব ছিলেন। বঙ্গবন্ধু দেখছেন, প্রতিটি পাতা উল্টাচ্ছেন। আর মুগ্ধ হয়ে বলছেন—আবেদিন ভাই, কী করে পারলেন! কিছুই তো ছিল না আমাদের! আপনি সরকারি বিজি প্রেসে এটা করেছেন! আবেদিন স্যার তখন বললেন, ‘হাশেম খান এটা চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল। সে বলেছে, যা কিছু করবে, সবই বাংলাদেশে। আমাদের উপায় নাই তাই শুধু কাগজটা কিনতে হয়েছে বাইরে থেকে। ও তো মুক্তিযোদ্ধা, গুলি খাওয়া। ওকে তো মেরেই ফেলেছিল, বেঁচে এসেছে।’ বঙ্গবন্ধু কোনো মন্তব্য করলেন না। দেখেই যাচ্ছেন। অনেক্ষণ দেখলেন, খুব প্রশংসা করলেন। বললেন, এত সুন্দর হবে সেটা আমার ধারণায় ছিল না। তারপর বললেন, আবেদিন ভাই, আমাদের এত নাইয়ের মধ্যে আপনি এত সুন্দর একটি কাজ করলেন। আমরাও চেষ্টা করেছি অল্প সময়ের মধ্যে এই দেশের সংবিধান রচনা করার। আমাদের যাত্রাটা সুন্দর হয়েছে, আমি কি পারব আপনার সংবিধানের মতো সুন্দর করে দেশটাকে তৈরি করতে? আবেদিন স্যার বললেন, বঙ্গবন্ধু, আপনার ডাকে সাড়ে সাত কোটি মানুষ দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে। এখনো তারা তৈরি। আপনি আমাদের শিল্পীদের বলেছেন, আমরা কাজ করে দিয়েছি। সব মানুষ তৈরি। আপনি ডাক দেন, সব মানুষ আপনার দিকে তাকিয়ে আছে। আপনি ডাক দিবেন যুদ্ধের মতোই সব মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়বে। সেদিন আমি মুগ্ধ হয়ে দুই জন মহামানবের কথা শুনছিলাম। একজন বঙ্গবন্ধু আরেকজন শিল্পাচার্য। এই যে তিনি বললেন, আমি কি পারব? আপনি শিল্পীদের নিয়ে যেভাবে সংবিধানটাকে করলেন, আমার দেশটাকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে। শিল্পাচার্য বললেন, দেশের মানুষ তৈরি, আপনি বলেছেন আমরা করে দিয়েছি। শুধু শিল্পীরাই নয়, প্রেসের লোকগুলোও যে কী আন্তরিকতার মধ্যে দিয়ে কাজ করেছে বলে শেষ করা যাবে না। এরপর বললেন, আপনারা তো এত কাজ করেছেন আবেদিন ভাই, আমি আপনার জন্য কী করতে পারি? আবেদিন স্যার বললেন, আমার জন্য কিছু করতে হবে না। তবে আমি অনেকদিন ধরে একটা স্বপ্ন দেখছি। সেই বিষয়ে আপনার সহযোগিতা চাই। বঙ্গবন্ধু আগ্রহ নিয়েই বললেন, সেটা কী বলেন। দেখেন আমি চারুকলা কলেজ করেছি। এই প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক শিল্পী বের হবে। সেখানে শিল্পকলা চর্চা হবে। আমাদের অন্য এক আসল শিল্পী হলো লোকশিল্পীরা, তারা গুরুত্ব হারাচ্ছে। এই যে কামার, কুমার, তাঁতি, যারা নকশিকাঁথা, কাঠের ঘোড়া, মাটির পুতুল বানাচ্ছে তারা গুরুত্ব হারাচ্ছে। এদেরকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার। এদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে কতগুলো জিনিস দরকার। এদের গ্রামগুলোকে বাঁচাতে হবে। সোনারগাঁ আমাদের ঐতিহ্যবাহী জামাদানির জায়গা। একসময় এখানেই মসলিন তৈরি হতো। ঈশা খাঁর রাজধানী ছিল এখানে। সেখানে যদি আমাকে কিছু জমি দেন, সেখানে একটি লোকশিল্প জাদুঘর ও বিশাল একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চাই। বঙ্গবন্ধু একটু মাথা তুলে তাকালেন। দুজনে চুপ। আমরা সবাই চুপ। বঙ্গবন্ধু বললেন, আবেদিন ভাই, আপনি আগামীকাল থেকে কাজ শুরু করে দেন। আমি এক্ষুনি শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে বলছি, ভূমি মন্ত্রণালয়কে বলে দিচ্ছি। আপনার এটা হবেই। আপনি শুরু করেন, কাকে কী করতে হবে বলে দিচ্ছি। শেষে বললেন, আবেদিন ভাই, একটা কথা মনে পড়ে গেল। আপনি যখন জাদুঘর করবেন, তখন তো ওখানে থাকবেন। স্যার বললেন, হ্যাঁ। আপনার থাকার জায়গার পাশে একটা চৌকি রাখবেন। আপনার মতোই একটা বিছনা রাখবেন। আমি মাঝে মাঝে কাউকে কিছু না বলে আপনার পাশে গিয়ে থাকব। কিছু নাইয়ের মধ্যে যে মানুষটি চমত্কার একটি সংবিধান আমার হাতে তুলে দিলেন, আমি সেই মহান শিল্পীর কাছে গিয়ে মাঝে মাঝে থাকব। তার কাছ থেকে প্রেরণা নিব, উত্সাহ নিব, ধারণা নিব—কীভাবে এই সোনার বাংলাকে এই সুন্দর সংবিধানের মতো গড়ে তুলব। আমার সেই মুহূর্তে মনে হলো, আমরা দুই মহামানবের কথা শুনছি। একজন বঙ্গবন্ধু, যিনি সোনার বাংলা গড়ে তুলতে চাইছেন; আরেকজন জয়নুল আবেদিন, যিনি আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের শিল্প-সাংস্কৃতির পুনর্জাগরণের জন্য পুরনো রাজধানী সোনারগাঁয়ে জাদুঘর গড়ে তুলতে চাইছেন। কিন্তু জাতির জন্য একটি দুর্ভাগ্য—এই দুই মহামানবকে আমরা খুব বেশি সময় পাইনি। জয়নুল আবেদিনকে ছিনিয়ে নিয়েছে মানবজাতির এখনো শত্রু দুরারোগ্য ক্যান্সার রোগ। আর বঙ্গবন্ধুকে ছিনিয়ে নিয়েছে জীবন ধ্বংসকারী ক্যানসারের মতোই লোভী, ঘৃণ্য সেনাবাহিনীর কিছু পথভ্রষ্ট কীট। আগস্ট এলে আমরা গভীর বেদনায়, শোকে নিমজ্জিত হই। জাতির জনককে যারা হত্যা করেছে তাদের জন্য চিরকালের ঘৃণা।

 

লেখক :চিত্রশিল্পী