ডিজিটাল যুগ মাথায় রাখিতে হইবে

দেশ এখন আর ব্রিটিশরাজের হাতে নাই। সময় অনেক গড়াইয়াছে। শুধু বাংলাদেশে নহে, সারা পৃথিবী একটি আধুনিক গতি পাইয়াছে। সর্ব অর্থেই। কোনোক্রমেই বর্তমান জীবনাচার  সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের সহিত  ঊনবিংশ শতাব্দীর জীবনকে মিলানো যাইবে না। প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত ফারাক হইয়াছে বিস্তর। যেই সড়ক ঊনবিংশ শতাব্দীতে ছিল সুরকি দিয়া তৈরি,  টুংটাং শব্দ করিয়া একটি বা দুইটি ঘোড়ার গাড়ি অথবা কদাচিত্ একটি ভিনটেজ কার ছুটিয়া যাইত,  সেই সড়ক এখন বিস্তৃত ঝকঝকে; একটার পিছনে আরেকটা দামি আধুনিক গাড়ি ছুটিয়া চলে। যেই জনপদের বিশাল জনগোষ্ঠী কখনো বিদ্যুতের নামও শুনে নাই, সেই জনগোষ্ঠীর ঘরে ঘরে শুধু বৈদ্যুতিক বাতিই নহে, চলিতেছে ফ্রিজ-এসি। যেই বাংলাদেশে একসময় সরকারি অফিস বলিতে মানুষ বুঝিত পুলিশ ও পোস্ট আফিসকে, সেই দেশে এখন রহিয়াছে ৪৩টি মন্ত্রণালয় এবং অসংখ্য অধিদপ্তর পরিদপ্তর। একটি সাধারণ শিশুর জীবনও এখন ইন্টারনেট-নির্ভর হইয়া পড়িয়াছে, যেই ইন্টারনেট সম্পর্কে কয়েক দশক পূর্ব পর্যন্ত মানুষের কোনো ধারণা ছিল না।

এই রকম পরিবর্তিত সমাজ ও রাষ্ট্র কোনোক্রমেই ১৮৬১ সালের ব্রিটিশের প্রণীত আইন দ্বারা পরিচালিত হইতে পারে না। মজার বিষয় হইল, যেই ব্রিটেন আমাদিগকে শাসন করিবার জন্য আইন প্রণয়ন করিয়া গিয়াছিল এবং মূল ভূখণ্ড অর্থাত্ ব্রিটেন শাসনের জন্য যে আইন বলবত্ ছিল তাহা প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হইয়াছে খোদ ব্রিটেন হইতে। কিন্তু আমাদের জীবনে এখনো রহিয়াছে ব্রিটেনের তৈরি আইন, যাহার মধ্য দিয়া আমাদের জীবন যাপন করিতে হয়। অবশ্য অনেক আইন পরিবর্তন হইয়াছে, সংশোধিত হইয়াছে এবং নূতন আইন প্রণীত হইয়াছে। কিন্তু বহু স্পর্শকাতর ক্ষেত্র রহিয়া গিয়াছে সেই মান্ধাতার আমলের আইন। যেমন পুলিশের কথাই বলা যাইতে পারে। শাসনব্যবস্থায় জনগণের সঙ্গে পুলিশ নিবিড়ভাবে জড়িত। পুলিশের আইনের অসংগতির কারণে একজন দোষী ব্যক্তি মুক্ত হইয়া যাইতে পারে, আবার একজন নির্দোষ মানুষ কারাবরণের করিতে হইতে পারে। এই রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এখনো বহু ধারা রহিয়াছে, যাহা ১৮৬১ সালে প্রণীত। সুতরাং আমাদের আইন মন্ত্রণালয়ের বিষয়টি খতিয়া দেখা উচিত।

বাংলাদেশে এখন এমন সকল মন্ত্রণালয় রহিয়াছে, যাহার ধারণা ব্রিটিশ শাসকদেরও ছিল না। যেমন ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রয়োজনও ছিল না এতত্সংক্রান্ত ধারণাও ছিল না। এখন ইহা অপরিহার্য। কিন্তু এই সকল মন্ত্রণালয়ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্রিটিশ আইনের আওতাভুক্ত হইয়া পড়িয়াছে। সুতরাং বিষয়টি লইয়া ভাবিতে হইবে। আমাদের দেশে সংসদ সদস্য তথা আইনপ্রণেতারা নূতন আইন প্রণয়ন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন ও সংশোধন করিয়া থাকেন। মন্ত্রণালয়গুলির উচিত হইবে, সময়োপযোগী, যথোপযুক্ত আইন তৈরি ও সংশোধনের জন্য নিয়মাতান্ত্রিক পথে প্রস্তাব উপস্থাপন করা। পৃথিবীব্যাপী সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আইনের সংশোধন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই ডিজিটাল যুগের কথা মাথায় রাখিয়া সর্বক্ষেত্রে আইন প্রণয়ণই এখন প্রত্যাশিত।