এসডিজি অর্জনে করোনা কেবল প্রতিবন্ধকতা নয়, সুযোগও

বাংলাদেশসহ জাতিসংঘভুক্ত ১৯৩টি রাষ্ট্র ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের নিমিত্তে ২০১৬ সাল থেকে কাজ করে আসছে। বিগত চার বছরে রাষ্ট্রগুলো ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে অসামান্য অভিযান তথা এসডিজি অর্জনে ব্রত ছিল, করোনার প্রাদুর্ভাব নিঃসন্দেহে এর সফলতার আশাকে ম্লান করে দিয়েছে। যদিও কোভিড-পূর্ববর্তী চার বছরের স্বল্প সময়ে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছিল না। তথাপি কিছু কিছু অর্জনকে মোটেও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।

৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (২০১৬-২০২১) এসডিজির লক্ষ্যসমূহ অন্তর্ভুক্ত করার পর থেকে কোভিড-পূর্ববর্তী সময়ে দেশে অতি দারিদ্র্যের হার ১২. থেকে ১০. শতাংশে এবং দারিদ্র্যের হার ২৪ থেকে ২০. শতাংশে নেমেছিল। ২০১৬ পরবর্তী চার বছরের জিডিপির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে .১১, .২৮, .৮৬, .১৫ শতাংশ ছিল। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম প্রকাশিত বৈশ্বিক লিঙ্গবিভাজন সূচক-২০১৮ অনুযায়ী বিশ্বে লিঙ্গ বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে এবং বিশ্বের ১৪৪টি দেশের মধ্যে ৪৮তম। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন জঁ দ্রজ তাঁদেরভারত: উন্নয়ন বঞ্চনাবইয়ে লিখেছেন, নারীর স্বাক্ষরতা শিক্ষায় ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতি অনেক বেশি। রাজনীতি, প্রশাসন অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ অগ্রযাত্রা দৃশ্যমান। তাছাড়া শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস, প্রাথমিক গণশিক্ষা খাতে অগ্রগতি, শিক্ষার হার বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থায় লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণ, খাদ্য নিরাপত্তা, বনভূমি বৃদ্ধি, মানব সম্পদ উন্নয়ন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সফলতা আশ্বস্ত করেছিল যে, বাংলাদেশ এমডিজির মতো এসডিজির ক্ষেত্রেও একটু দেরিতে হলেও সফল হতে পারবে।

কিন্তু করোনা মহামারি এসডিজির অগ্রগতিকে থমকে দিয়েছে। আগের সফলতাসমূহকেও অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। জাতিসংঘের ফাইন্যান্সিং ফর সাসটেইন্যাবল ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট-২০২০ বলছেকোভিড-১৯ সংকটের জন্য টেকসই উন্নয়নের অনেক কার্যক্রম প্রবলভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একইভাবে জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্স-এর মতে, করোনার ফলে টেকসই উন্নয়নের বৈশ্বিক কর্মকৌশল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এর কারণে অর্থনৈতিক সামাজিকসহ প্রায় প্রতিটি অভীষ্টই বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তবে এই বৈশ্বিক মহামারি অনিচ্ছাকৃতভাবেই আশীর্বাদ নিয়ে এসেছে পরিবেশ জলবায়ুর ওপর (এসডিজি-১৩) বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পরিবহন শিল্পের সীমিত কার্যক্রমের ফলে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমেছে। ধুলাবালি বর্জ্য উত্পাদন কমে যাওয়ায় বায়ু পানিদূষণ কমেছে; যা স্থলজ উদ্ভিদ জলজ সম্পদের সংরক্ষণ টেকসই ব্যবহারে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে (এসডিজি-১৪) গবেষণা বলছে, চীনে প্রথম দুই মাসের লকডাউন অন্যান্য ব্যবস্থার ফলে এয়ার ট্র্যাফিক, তেল বিশোধন কয়লার ব্যবহার কমে যাওয়ায় ২৫ শতাংশ কার্বন ৫০ শতাংশ নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গমন কমেছে। যার ফলে কমপক্ষে ৭৭ হাজার জীবন রক্ষা পেতে পারে। 

কোভিড-১৯ সরাসরি প্রভাবিত করেছে দারিদ্র্য-বিমোচন (এসডিজি-), ক্ষুধামুক্তি (এসডিজি-) তথা জনস্বাস্থ্য সমৃদ্ধিকে (এসডিজি-) একইভাবে প্রভাবিত করছে অর্থনৈতিক কার্যকলাপ কর্মসংস্থান (এসডিজি-), লিঙ্গ সমতা অর্জন (এসডিজি-), শিল্পখাতে উত্পাদন কর্মসংস্থান (এসডিজি-), শান্তি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা (এসডিজি-১৬) এবং জনসংখ্যার আয়ের বৈষম্য কমিয়ে আনাকে (এসডিজি-১০) সিপিডির তথ্যানুসারে, করোনায় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ইতিমধ্যেই ৩৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী আমদানি-রপ্তানি পণ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে। কর্মসংস্থান পরিস্থিতিও ভয়াবহ। এডিবির সাময়িক হিসাব অনুযায়ী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশব্যাপী কর্মহীন মানুষের সংখ্যা ১৪ লাখে দাঁড়াতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য ইউরোপে করোনা পরিস্থিতিতে কর্মচ্যুত হয়ে প্রচুর বাংলাদেশি দেশে ফিরে আসছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুসারে, চলতি বছরেই বাংলাদেশের রেমিট্যান্স ২২ শতাংশ কমে যেতে পারে। এমতাবস্থায় করোনা-পরবর্তী বিপর্যস্ত অর্থনীতির ধাক্কা সামলিয়ে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা: দারিদ্র্য ১০ শতাংশে কমিয়ে আনা, উত্পাদনশীল কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ ৫০ শতাংশে উন্নীত করা, বেকারত্ব শতাংশে নামিয়ে আনা এবং জিডিপির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের ঊর্ধ্বে উন্নীত করা আদৌ সম্ভব হবে কি না সন্দেহ রয়েছে।

করোনা মহামারি ভালো করেই বুঝিয়ে দিয়েছে যে আমাদের অভিঘাত সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই শিল্পায়নের প্রবর্ধন এবং গবেষণাভিত্তিক উদ্ভাবনার সম্প্রসারণ দরকার (এসডিজি-) একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, অর্থনীতি, প্রশাসনসহ সর্বক্ষেত্রে প্রয়োজন ডিজিটালাইজেশন অর্থাত্ শতভাগ জনসংখ্যাকে ইন্টারনেট সুবিধায় আনা (এসডিজি-১৭)

 কোভিড-১৯ স্বাস্থ্য খাতের ভগ্নদশাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। বুঝিয়ে দিয়েছে যে কোনো দুর্যোগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের চিকিত্সাব্যবস্থা একেবারেই অপ্রস্তুত। তাই জনস্বাস্থ্য রক্ষার সামর্থ্য নিরূপণ করে এই খাতে আশু পদক্ষেপ জরুরি। এসডিজি- অনুযায়ী শতভাগ বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও তৃণমূলে এর দুষ্প্রাপ্যতার জন্য জরুরি অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। করোনার ফলে সৃষ্ট দারিদ্র্যে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণও খুবই চ্যালেঞ্জিং হবে।

উপর্যুক্ত ইতিবাচক নেতিবাচক হিসাব-নিকাশ থেকে প্রশ্ন জাগতেই পারে, বৈশ্বিক মহামারি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আমাদের এত দিনের স্বপ্ন চেষ্টাকে কি ধুলোয় মিশিয়ে দেবে? মোটেই নয়। বরং ব্যাপারটিকে অন্যভাবেও দেখা যায়। মূলত এই কোভিড-১৯-এর আক্রমণ দেশের উন্নয়নের পথে অনাবিষ্কৃত গহ্বরগুলোকে স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করেছে। যা হাজার বছরের গবেষণায় আদৌ সম্ভব হতো কি না সন্দেহ। এখন বোঝাই যাচ্ছে, যেগুলোকে এত দিন টেকসই উন্নয়নের পথে চরম অগ্রগতি ভেবে বসেছিলাম তার বেশির ভাগই ছিল আদতে উন্নয়ন ফাঁদ। সুতরাং যদি সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করা যায় তবে এই মহামারিও হতে পারে সাপে বর। অর্থাত্ এই করোনা এসডিজিকে পর্যালোচনা করে নতুন করে কর্মপন্থা কৌশল নির্ধারণের সুযোগ করে দিয়েছে। 

তাই মুহূর্ত থেকেই তৃণমূলভিত্তিক উন্নয়নে মনোনিবেশ করা উচিত। এই মহামারির সময় বারবার আমাদের অতিকেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থার নানান প্রশংসনীয় পদক্ষেপ তৃণমূলে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে। এভাবে আর যা- হোক, অন্তর্ভুক্তিমূলক তথা টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই করোনার ফলে সৃষ্ট বৈষম্য দারিদ্র্য দূরীকরণের নামে দুর্নীতি, অপচয় অব্যবস্থাপনাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রীয় বাজেট সুযোগ-সুবিধার সুষ্ঠু বণ্টন, সুসমন্বয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত একান্ত জরুরি। আশা করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়চেতা নেতৃত্বে এসডিজি সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের অংশীদারিত্বে করোনায় সৃষ্ট চ্যালেঞ্জসমূহ সফলভাবে মোকাবিলা করে বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরায় ঘুরে দাঁড়াবে এবং এসডিজির অগ্রযাত্রায় গতি সঞ্চারিত হবে। 

n লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়