নারীর নাম তৈরির যাত্রা থেমে যাবে না তো?

একটি শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে, তখন পরিবার তার একটি নাম দেয়। শিশুটি ছেলে হলে কালের যাত্রায় তার নামের পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। বিশেষ ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়, যেমন ধরা যাক প্রথম শ্রেণির একটি বালকের নাম কাশেদ। ক্লাসের শিক্ষকের আবার এই নাম ভারি অপছন্দ, তিনি কাশেদের নামের ক-এর কান কেটে বানিয়ে দিলেন র। অতঃপর কাশেদের পিতৃপ্রদত্ত নাম পরিবর্তিত হয়ে হলো রাশেদ!

ভিন্নভাবেও ছেলেদের নামের পরিবর্তন হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বনফুলের নাম। লেখক বনফুল বাংলার অন্যতম ছোট গল্পকার। তার পিতৃপ্রদত্ত নাম আসলে বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়। সাহিত্য রচনার  সুবিধার্থে তিনি তার ছদ্ম নাম বনফুল রেখেছেন। এ তো গেল নাম পরিবর্তনের ইতিবাচক কারণ। কিন্তু অনেক সময় নেতিবাচক চরিত্রের জন্যও নাম পরিবর্তন করা হয়। এর বাস্তব উদাহরণ দিলে অনেকে গোস্বা করতে পারেন, তাই উদাহরণ না দিয়ে ক্ষেত্রের বর্ণনা দেওয়াই ভালো। আমাদের দেশের ছিঁচকে চোর থেকে শুরু করে হ্যাংলা, মোটা, বেঁটে, বড়লোক চোর সব ধরনের চোরেরই একটা দ্বিতীয় নাম থাকে। স্থান-কাল-পাত্রভেদে একাধিক নাম থাকে। সময়ের স্রোতে এদের পরিবার প্রদত্ত নাম জাদুঘরে রাখার মতো অবস্থায় থাকে।

এসব হলো নাম পরিবর্তনের বিশেষ কারণ। এই বিশেষ কারণগুলো নারী-পুরুষ সবার জন্যই সমভাবে প্রযোজ্য। তবে নারীর নাম পরিবর্তনের যাত্রা বড়ই অদ্ভুত ও ব্যতিক্রম। শিশুকালে নারীর পরিচয় এক রকম তো যৌবনে আরেক রকম, আবার বৃদ্ধকালে অন্য রকম। লোকেরা কথায় বলে, নারীর নির্দিষ্ট কোনো পরিচয়  নেই। জল যেমন একেক পাত্রে একেক আকার ধারণ করে, তেমনি নারীর পরিচয়ও স্থান-কাল-পাত্রভেদে ভিন্ন হয়। শিশুকালে একটি বালিকার পরিচয় হয় বাবা কিংবা ভাই। আরে তুমি তো অমুকের বোন কি অমুকের মেয়ে। তখন নামের আগে স্থান করে নেয় মিস নামক ভিনদেশি শব্দ আর নামের শেষে থাকে পিতার পদবি চাটুজ্যে কিংবা আরবীয় কায়দায় বিনতে হাসান-হোসেন। যৌবনে বিয়ের পর নারীর নাম পরিবর্তন হয় স্বামীর নামকে কেন্দ্র করে। হয়তো সার্টিফিকেটের নামের পরিবর্তন হয় না, কিন্তু নারীকে পরিচয় দিতে হয় মিসেস অমুক রহমান বলে। সময় বয়ে যায়, নারীর কোল আলো করে সন্তান আসে। সন্তানের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীর নাম হয় অমুকের মা তমুকের মা। আর তার যে একটা নাম ছিল প্রিয়দর্শিনী বা রহিমা নামে, তার আর খোঁজ পাওয়া যায় না।

অথচ একটা পুরুষ আজীবন তার পরিবার প্রদত্ত নামই বহন করে। বিয়ের পর তাকে বলা কিংবা লেখা লাগে না মিস্টার্স রহিমা বা প্রিয়দর্শিনী। এর পেছনে একটা কারণ থাকতে পারে, তা হলো অধিকাংশ নারী কাজের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করতে পারে না। একটি নারী তার পরিবারের জন্য জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ—সবই করে থাকে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তার এই কাজ অর্থের মাপকাঠিতে মাপা হয় না। নারীর নাম অনেকটা শুঁয়াপোকা ও প্রজাপতির কাহিনির মতো। তবে শুঁয়াপোকাও একদিন প্রজাপতি হয়ে রংবেরঙের ডানা মেলে নীল আকাশে উড়ে যায়। নারী যোগ্যতা অর্জন করে ক্যারিয়ার গড়লেও প্রজাপতির মতন পাখা মেলে উড়তে পারে না। সমাজ তাকে বারবার এলার্ম দিয়ে জানিয়ে দেয়, তুমি মিসেস অমুক বা তমুকের মা।

তবে আধুনিক সমাজে নারীর নাম পরিবর্তনের সংস্কৃতি অনেকটাই পরিবর্তনের পথে। আজকাল অনেকেই নিজেকে মিসেস পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না কিংবা স্বামীর টাইটেল গ্রহণ করেন না। এর অন্যতম কারণ নারীরা আজ ঘরে-বাইরে যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছেন, পাশাপাশি সমাজে অনুবাস ও একক পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারী শিক্ষার হার বাড়ছে। নারীরা আজ বুঝতে শিখেছে, নামের মধ্যে রয়েছে স্বকীয়তা। নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে সমাজ ধাবিত হচ্ছে। কিন্তু করোনাকালে নারী শিক্ষার হার কি কমে যাবে? আর যদি কমে যায় তাহলে তারা কি পূর্বের দিকে ধাবিত হবে। এমন অবস্থায় নারীর নিজের নাম তৈরির যাত্রা থেমে যাবে না তো?

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়