শোককে শক্তিতে পরিণত করে দেশকে এগিয়ে নেওয়া, করোনার দুর্যোগ মোকাবিলা করে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা, জাতির পিতার পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের রায় কার্যকর, বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্য ষড়যন্ত্রকারীদের বিচারের আওতায় আনা, মাদক-সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদসহ দেশবিরোধী সব ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে ক্ষুধা-দারিদ্র্য-নিরক্ষরমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযোগ্য মর্যাদায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে গতকাল শনিবার পালিত হলো স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৫তম শাহাদতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস। নতুন শপথে বলিয়ান বাঙালি জাতি ভয়াল সেই রাতের শোকাবহ স্মৃতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করে জাতির পিতাকে।
বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা :সকালে দেশ ও জাতির পক্ষ থেকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর একটি সুসজ্জিত চৌকস দল এ সময় রাষ্ট্রীয় সালাম জানায়, বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। পরে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের শহিদদের স্মরণে অনুষ্ঠিত বিশেষ মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুলও উপস্থিত ছিলেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রধানমন্ত্রী মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে পরিবারের স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ভবনটিতে যান (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর) এবং কিছু সময় সেখানে অবস্থান করেন, যেখানে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ পরিচালিত হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী পরে বনানী কবরস্থানে যান, যেখানে তার মা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তিন ভাই শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেলসহ সেদিনের ঘটনায় নিহত পরিবারের অন্য সদস্যদের সমাহিত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের পর কবরগুলোতে ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে দেন। ফাতেহা পাঠ করেন এবং বিশেষ দোয়ায় শরিক হন।
শোকার্ত মানুষের ঢল :প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সর্বস্তরের মানুষের জন্য ধানমন্ডি ৩২ নম্বর চত্বর উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। শুরু হয় সর্বস্তরের নেতাকর্মী আর সাধারণ মানুষের ঢল। করোনায় সীমিত পরিসরে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আহ্বান জানানো হলেও তা উপেক্ষিত ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রতি সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও বিভিন্ন সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে মহান নেতাকে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়। শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসা সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এ সময় ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘পলাতক খুনিদের ফাঁসি চাই’সহ বঙ্গবন্ধুর নামে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়।
গতকাল বঙ্গবন্ধুর বাসভবন প্রাঙ্গণ, বনানী কবরস্থান এবং টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজারস্থল হয়ে উঠেছিল শোকার্ত মানুষের মিলন মোহনা। শহর জুড়ে দেওয়ালে দেওয়ালে শোকের তোরণ ও পোস্টার, কালো পতাকা, বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের সেই ভাষণ ও স্মৃতিজাগানিয়া গানে গোটা রাজধানীর পরিবেশটাই পালটে গিয়েছিল। শুধু আওয়ামী লীগই নয়, সারা দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী প্রতিটি মানুষ, সংগঠন এবার বিস্তারিত কর্মসূচির মাধ্যমে স্মরণ করছে মহান স্বাধীনতার স্থপতিকে।
গতকাল সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ভবন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করে তোলা হয়। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনসমূহেও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষ্যে গতকাল ছিল সরকারি ছুটি। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু ভবন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশে দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আলোচনা সভা, জাতীয় শোক দিবসের সঙ্গে তাত্পর্যপূর্ণ কবিতা পাঠ, রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, হামদ-নাত প্রতিযোগিতা ও দোয়ার আয়োজন করা হয়। বাদ জোহর সারা দেশে সব মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। দিনভর চলেছে কাঙালিভোজ। দেশের সব সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতালসহ জেলা ও উপজেলা হাসপাতাল এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়।
মা-ভাইয়ের সমাধিপাশে শোকবিহ্বল প্রধানমন্ত্রী :গতকাল ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় বনানীর কবরস্থানের সারি বাঁধা ১৮টি কবর। এসব কবর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নরপিশাচ ঘাতক চক্রের নির্মম বুলেটে নিহত বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শিশুপুত্র রাসেলসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের। সকালে মা-ভাইদের কবরে গিয়ে চোখের জল থামিয়ে রাখতে পারেননি স্বজনহারা শোকবিহ্বল শেখ হাসিনা। তিনি অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রিয় স্বজনদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে মোনাজাত ও ফাতেহা পাঠ করেন। নিজ হাতে মুঠো মুঠো ভালোবাসার ফুল ছড়িয়ে দেন প্রিয় স্বজনদের কবরে। নেতাকর্মী, মন্ত্রী-এমপিদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বনানী কবরস্থানে গেলে সেখানে এক অন্যরকম আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সকাল থেকেই সেখানে চলে শহিদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় কোরআনখানি ও দোয়া মাহফিল। প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে একে একে আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও শহিদদের কবরে শ্রদ্ধা জানান।
বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের শ্রদ্ধা :এদিকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া ও চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী। পরে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এছাড়া জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টি বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এছাড়া সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব পরিষদ, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, নজরুল ইনস্টিটিউট, শিশু একাডেমি, খেলাঘর, বাংলাদেশ বেতার, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ, বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা কৃষিবিদ পরিষদ, জাতীয় কবিতা পরিষদসহ অসংখ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়।
১০০ বার কোরআন খতম : জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গতকাল জাতীয় মসজিদে ১০০ বার কোরআন খতম, আলোচনা সভা ও বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ধর্মবিষয়ক সচিব মো. নূরুল ইসলাম। এর আগে সকালে জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি উদ্বোধন করা হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন আগারগাঁওস্থ প্রধান কার্যালয়ে দিনব্যাপী চলে ফ্রি চিকিত্সাসেবা কার্যক্রম ।
আওয়ামী লীগের উদ্যোগে মিরপুর এলাকায় মসজিদগুলোতে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। একাধিক স্থানে কাঙালিভোজের আয়োজন করা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আসলামুল হক। ঢাকা দক্ষিণ সিটি মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের নির্দেশনায় দুস্থদের বাড়িতে গিয়ে কাঙালিভোজ বিতরণ করা হয়।
বঙ্গবন্ধুর প্রতি জেপির শ্রদ্ধা :জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষ্যে সকাল সাড়ে ৬টায় জেপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সব কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। সকাল ৮টায় ধানমন্ডিস্থ ৩২ নম্বর রোডে জেপির পক্ষ হতে দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলামের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এজাজ আহমেদ মুক্তা, আজিজ বাঙাল, ভাইস চেয়ারম্যান মীর হারুন অর রশিদ, মোহাম্মদ হোসেন রেনু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান খলিল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও দপ্তর সম্পাক এম সালাহ উদ্দিন আহমেদ, সহসাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, আমিনুল ইসলাম তপন, কে. এম মুজিবুর রহমান মজনু, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল খায়ের সিদ্দিকী আবু, বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (ঢাকা) হাজী আবুল হোসেন, পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক মো. নূরুল ইসলাম মিয়া খান, যুগ্ম প্রচার সম্পাদক মঞ্জুর হাবিব মঞ্জু, যুগ্ম দপ্তর সম্পাদক জীবন কৃষ্ণ বৈরাগী, জাতীয় যুব সংহতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এস এম বিপ্লব প্রমুখ।
সকাল ৯টায় বনানী কবরস্থানে বেগম মুজিবসহ ১৫ আগস্টের শহিদদের এবং জাতীয় চার নেতার মাজারে জিয়ারত, ফাতেহা পাঠ, পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ এবং মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন জেপি নেতৃবৃন্দ। মোনাজাত পরিচালনা করেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম। এছাড়া বেলা ১১টায় টুঙ্গিপাড়ায় গোপালগঞ্জ জেলা ও উপজেলা শাখা জেপির নেতাকর্মীরা জাতির পিতার মাজার জিয়ারত, ফাতেহা পাঠ ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। কুড়িগ্রামে জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক এমপি রুহুল আমিনের নেতৃত্বে বাদ জোহর দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।