‘ঘুষ খায় দারোগায়’

বিখ্যাত সাহিত্যিক সুকুমার রায় তার এক ছড়ায় ‘ঘুষ খায় দারোগায়’ বলে দারোগা বা পুলিশের ভাবমূর্তির বারোটা বাজিয়ে গেছেন। দারোগা-পুলিশদের অবশ্য ভাবমূর্তি নিয়ে খুব একটা বিকার আছে বলে মনে হয় না। তারা অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ঘুষের বাইরেও টাকা খাওয়ার নানা রকম পথ-পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, সেসব নিত্যনতুন পথ-পদ্ধতির অনুশীলন ও চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা যমের ভূমিকাও পালন করছেন। কারো সঙ্গে বনিবনা বা হিসেবের মিল না হলে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে পরপারেও পাঠিয়ে দেন।

পুলিশ নিয়ে আমাদের দেশের অনেক মানুষের অভিযোগের সীমা নেই। পুলিশ খারাপ। পুলিশ অপরাধ দমন ও অপরাধীদের ধরতে পারে না। পুলিশ ঘুষ খায়, চাঁদাবাজি করে। অপহরণ করে। ছিনতাইও করে। নিরীহ মানুষকে হয়রানি করে। মামলা নিতে চায় না। মামলা নিলেও তদন্ত ঠিকমতো করে না। পুলিশ আর অপরাধ সমার্থক হয়ে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে কয়েক জন পুলিশ সুপার, অ্যাডিশনাল পুলিশ সুপার, থানার ওসি, ইন্সপেক্টর, এসআই ও কনস্টেবলের নাম আছে।

করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ কমে এসেছিল। বরং অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ পরিণত হয়েছিল সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীকে। করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীকে বাড়ি থেকে হাসপাতালে নিয়ে আসা, চিকিত্সা শেষে বাসায় পৌঁছে দেওয়া, কখনো হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিদের নজরদারি করা, এমনকি অভাবী মানুষের জন্য বরাদ্দ সরকারি ত্রাণ যেন চুরি না হয়, সেজন্যও তারা ভূমিকা পালন করছেন। কোথাও করোনা ভাইরাসের রোগীর হদিস পেলেই গড়ে তুলছেন ব্যারিকেড। আগলে রেখেছেন সবাইকে। যখন স্বজনরাও করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, তখন পরম মমতায় পুলিশ এগিয়ে এসেছেন লাশ দাফনে। আচরণে, দায়িত্ব পালনে, কর্তব্যবোধে এক ভিন্ন আচরণের পুলিশের দেখা মেলে বাংলাদেশে। করোনাকালে দায়িত্বপালন করতে গিয়ে বহু পুলিশ জীবন দিয়েছেন। সত্যিকার ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ওঠেন তারা। পুলিশের এমন অনন্য ভূমিকা বাংলাদেশের মানুষ অতীতে কখনো দেখেনি!

কিন্তু আমাদের দেশে ভালো কিছু, সুন্দর কিছু দীর্ঘস্থায়ী হয় না। করোনা পরিস্থিতির একটু উন্নতি হওয়ামাত্র আবার পুলিশের বিরুদ্ধে নানান রকম অপকর্মের অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। কক্সবাজারের টেকনাফে সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশ জুড়ে শুরু হয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা। ঐ ঘটনায় ওসি প্রদীপ কুমার দাশ এবং এসআই লিয়াকতসহ সাত জনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বেরিয়ে আসছে প্রদীপ-লিয়াকতদের নানা অপকর্মের তথ্য।

আমাদের দেশে পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। প্রদীপ-লিয়াকতের মতো পুলিশ সদস্যও একেবারে বিরল নয়। প্রায়ই এ ধরনের পুলিশ সদস্যদের অপকর্মের কাহিনি সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। ফেনীর নুসরাত জাহান হত্যাকাণ্ডের সময় ওসি মোয়াজ্জেমের ঘটনা কিংবা ডিআইজি মিজানের ঘটনা, সর্বশেষ ওসি প্রদীপের ঘটনার কারণে পুলিশের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। যদিও পুলিশপ্রধান গণমাধ্যমে বলেছেন, ব্যক্তির অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠানের নয়। প্রতিষ্ঠান এই দায়দায়িত্ব নেবে না, ব্যক্তি যে অপরাধ করবে এই দায়িত্ব ব্যক্তিকেই নিতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন পুলিশের যে কোনো কাজের দায় পুলিশ বাহিনীর ওপরই বর্তায়। কারণ সংস্থা ভালো কাজের জন্য পুরস্কার এবং খারাপ কাজের জন্য তিরস্কার (শাস্তি) করে ব্যক্তিকে ঠিক পথে রাখার চেষ্টা করে। তাই তো সর্বশেষ সিনহা মো. রাশেদ খান নিহত হওয়ার ঘটনায় পুলিশের ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বিতর্কিত ওসি প্রদীপ সম্পর্কে যেসব তথ্য গণমাধ্যমে বেরিয়েছে, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, প্রদীপের এই ঘটনাগুলো এতদিন কারো নজরে আসেনি কেন? কেন সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের প্রদীপ সম্পর্কে এসব তথ্য জানা গেল? আমাদের দেশে কেউ যদি কোনো দোষ বা অপরাধ করে, তাহলে তা স্বীকার করে না বা স্বীকার করতে চায় না। পুলিশ হলে তো আরো না। পুলিশের বিরুদ্ধে যখনই কোনো বড় অভিযোগ সামনে চলে আসে তখনই তারা তাড়াহুড়ো করে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে সব দায় চাপিয়ে নিজেদের মহত্ প্রমাণের চেষ্টা করে। অনেক ক্ষেত্রে ‘বিভাগীয় ব্যবস্থা’ নেওয়া হয়। এটাও এক আজব ব্যবস্থা। কোনো পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো কিছু ঘটলেই তাত্ক্ষণিকভাবে অভিযুক্তদের ‘ক্লোজড’, ‘সাময়িক বরখাস্ত’, ‘বদলি’—এই হচ্ছে ‘বিভাগীয় ব্যবস্থা’। এতে আসলে তাদের কী হয়, সেটা জানা যায় না। আমরা বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিতদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাবাস, অর্থদণ্ড, মৃত্যুদণ্ড ইত্যাদি হতে দেখি। কিন্তু অপরাধী পুলিশের কী হয়? আদৌ কি কিছু হয়? ‘ক্লোজড’, ‘সাময়িক বরখাস্ত’, ‘বদলি’, ‘বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ’ ইত্যাদি কি আসলে আইওয়াশ?

পুলিশের খারাপ কাজের প্রসঙ্গ এলেই বলা হয়, তাদের বেতন কম, সুযোগ-সুবিধা কম, ছুটি নেই, চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা নেই, অতিরিক্ত সময় ধরে ডিউটি করতে হয়। বলা হয়, সরকার যেহেতু পুলিশের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল তাই পুলিশ সরকারের কথা শোনে না। এমন কথাও বলা হয়, একটি বিশেষ জেলার লোককে পুলিশে ঢোকানে হচ্ছে, পুলিশে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতির জন্য এখন কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়, তাই তারা এই টাকা তুলে নেওয়ার জন্য বেপরোয়া ঘুষ-দুর্নীতি-ছিনতাই-চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হয়। অনেকে আবার সমাজের সার্বিক অবক্ষয়ের দোহাই দেন। বলেন, যেখানে সমাজের বেশির ভাগ মানুষ অসত্, দুর্নীতিবাজ, ধান্দাবাজ, সেখানে পুলিশ ভালো থাকে কী ভাবে? এসব কথার মধ্যে যুক্তি আছে অবশ্যই। কিন্তু এসব কথা পুলিশের যাবতীয় অপকর্মকে এক ধরনের দায়মুক্তিও দেয়। বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত এক-আধটা ছোটখাটো অপরাধমূলক তত্পরতায় পুলিশ বাহিনীর কোনো কোনো সদস্য জড়িত থাকতেই পারে, কিন্তু একটা পুরো বাহিনীর ইমেজ যখন অপরাধের সঙ্গে সমার্থক হয়ে যায়, জাতীয়ভাবে একটা নেতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে তখন সেটা অবশ্যই বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যাদের হাতে অপরাধ দমন ও শৃঙ্খলা রক্ষার ভার, তারাই যদি অপরাধী ও বিশৃঙ্খল, বেপরোয়া হয়ে যায়, তখন আমাদের আর ভরসার জায়গা থাকে কোথায়?

সেবাই পুলিশের ধর্ম—এই মূলমন্ত্রে দীক্ষিত করা হয় সব পুলিশ সদস্যকে। জনগণের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব তাদের। দেশের জনসংখ্যা অনুপাতে পুলিশের সংখ্যা কম। বিভিন্ন মহল থেকে পুলিশ সদস্য বাড়ানোর কথা মাঝেমধ্যে উঠে আসে। নিয়মানুসারে পুলিশ জনগণের বন্ধু হিসেবে পরিচিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন কথা বলছে। পুলিশকে বন্ধু ভাবা তো দূরে থাক, শত্রু ভাবতেও আমাদের দেশের মানুষ ইচ্ছুক নন। এর পেছনের কারণটা হলো কিছু কিছু পুলিশ সদস্যের বিপথগামিতা। এই পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন ধরনের অপরাধকর্মে নিজেদের জড়িয়ে ফেলছেন। মামলা তদন্তে ঘুষ নেওয়া, গ্রেফতার বা ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করার পাশাপাশি ছিনতাই-ডাকাতি, মাদক কেনাবেচা, ধর্ষণসহ বড় ধরনের অপরাধে পুলিশের জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে পুলিশের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হচ্ছে। বাংলায় তো প্রবাদতুল্য কথাই আছে, ‘বাঘে ছুলে দশ ঘা, পুলিশে ধরলে আঠারো ঘা’! সুতরাং পুলিশ হইতে সাবধান! শিশু কথা শুনছে না, সময়মতো খাচ্ছে না, ঘুমাচ্ছে না? বলা হচ্ছে, ‘পুলিশ ডাকব কিন্তু!’ এই হলো আমাদের দেশে পুলিশের ভাবমূর্তি! শৈশব থেকেই সবাই জানে, পুলিশ ভীতিকর, ‘জনগণের বন্ধু’ বললেও খুব না ঠেকলে কেউ তাকে বন্ধু ভাবে না। অথচ ছোট-বড় যে কোনো সমস্যায় পুলিশের দ্বারস্থ হতে হয় সবাইকেই। সব সময় সবাইকে আশাহত হয়েই ফিরতে হলে একটা দেশের হাল যে কী হবে তা কল্পনা করলেও গা শিউরে ওঠে!

পুনশ্চ :থানাপুলিশকে আমাদের দেশে আসলে কখনোই ভালো চোখে দেখা হতো না। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে একটি ব্রিটিশ আমলের গল্প। শোনা গেল কোনো এক গ্রামে থানা বসবে। গ্রামবাসীর মাথায় হাত। এবার কী হবে? আশপাশের দশগ্রামের মানুষ নিয়ে সভা হলো। সভায় সিদ্ধান্ত হলো, সদরে গিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবকে আবেদন জানানো হবে। দশগ্রামের মানুষ সম্মিলিতভাবে চিঠিতে লিখল, মাননীয় সরকার বাহাদুর, আমাদের এলাকাটি অত্যন্ত শান্তিপ্রিয়। বিগত কুড়ি বছরে এ এলাকায় কোনো খুন-রাহাজানি-ডাকাতি হয়নি। দয়া করে এ এলাকায় থানা বসাবেন না। কেননা থানা বসলেই থানার খরচ চালাতে, ছোটবাবুর খাই মেটাতে মিথ্যা মামলা হবে। আসামি ধরে সদরে চালান করা হবে। গ্রামবাসীর মহাবিপদ হবে। তাই থানার দরকার নেই!

n লেখক :রম্যরচয়িতা