এবার মুজিববর্ষে পালিত হলো বঙ্গবন্ধুর ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। বছর জুড়েই চলছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আলোচনা। এখনো চলছে। সারা বছরব্যাপী চলবে। করোনার জন্য প্রকাশ্য কোনো আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। কিন্তু সারা পৃথিবীতে অনলাইনে অসংখ্য আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৫ আগস্ট তারিখে আমি নিজেই কমপক্ষে ছয়টি আলোচনাসভায় অংশ গ্রহণ করেছি। অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, আমেরিকা, বাংলাদেশের ময়মনসিংহ (কৃষি বিদ্যালয়) এবং লন্ডনের দুটি—এই এতগুলো অনুষ্ঠানে এক দিনে যোগ দিয়েছি। ঘরে বসে এই আলোচনাসভায় অংশগ্রহণ। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এটা সম্ভব হয়েছে। লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের দ্বারা আয়োজিত আলোচনা বৈঠকে অনেক বিদেশি এমপি রাজনীতিবিদ অংশগ্রহণ করেছেন।
বিস্ময়করভাবে বাংলাদেশের সিলেট এবং আমেরিকার টেক্সাস থেকে একযোগে প্রচারিত একটি প্রাণবন্ত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছি। যে আলোচনাসভার নাম ছিল রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গবন্ধু। টেক্সাস থেকে অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেছেন অধ্যাপক নাভিদ এবং তাতে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী শ্রেয়া গুহ ঠাকুরতা।
এবার একটি বিষয় লক্ষ করেছি, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক আলোচনাতেই তার ঐতিহাসিক ছয় দফা উঠে এসেছে। অনেকেই বলেন, ছয় দফা ছিল বাংলাদেশের ম্যাগনা কার্টা। যারা ম্যাগনা কার্টার প্রকৃত তথ্য জানেন, তারা বলেন, ম্যাগনা কার্টা যদিও ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা কর্তন করে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার পথ প্রশস্ত করেছিল; কিন্তু ম্যাগনা কার্টা তৈরি হয়েছিল তদানীন্তন ব্রিটিশ ব্যারনদের (জমিদারদের) হাতে ক্ষমতা আনার জন্য। ম্যাগনা কার্টার সঙ্গে ছয় দফার পার্থক্য এই যে, ছয় দফা বাংলাদেশের ভূস্বামীদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দাবিনামা হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল।
এই ছয় দফা তৈরি করেছিলেন কে, এটা নিয়ে বাজারে সব অদ্ভুত তথ্য ইদানীং তৈরি ও প্রচার করা হচ্ছে। একটি তথ্য হলো প্রয়াত রুহুল কুদ্দুসসহ কয়েক জন তরুণ বাঙালি সিএসপি অফিসার এই ছয় দফা তৈরি করে বঙ্গবন্ধুকে দেন, বঙ্গবন্ধু এটা গ্রহণ করেন এবং ছয় দফার ভিত্তিতে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই তথ্যটি সত্য হলে আপত্তি করার কিছু ছিল না। কিন্তু জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলা যেমন অসত্য, তেমনি ছয় দফা দাবি সম্পর্কে প্রচারণাটিও অসত্য।
ছয় দফা দাবি প্রস্তুত করা থেকে উত্থাপন করা পর্যন্ত আমি যদি এর সঙ্গে জড়িত না থাকতাম, তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রকৃত পটভূমি এই ছয় দফা সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতে পারতাম না। বিস্ময়ের কথা, বঙ্গবন্ধু অর্থনীতিবিদ ছিলেন না এবং অর্থনীতির ছাত্রও ছিলেন না। কিন্তু দেড় হাজার মাইলের ভৌগোলিক ব্যবধানে গঠিত রাষ্ট্রের পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলের জন্য যে দুই অর্থনীতি প্রয়োজন, তা বুঝতে পেয়েছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র আট বছরের মধ্যে তিনি পাকিস্তানের দুই অংশের জন্য দুই অর্থনীতি প্রবর্তন এবং বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিক্রয় কর প্রদেশের হাতে দেওয়ার দাবি জানান।
দুই অর্থনীতির দাবি জানানোর জন্য ঢাকার মাহবুব আলী ইনস্টিটিউটে একটি সর্বদলীয় সভা করেন। যে সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন, এমন অর্থনীতিবিদেরা, প্রয়াত অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকও যোগ দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তখন ‘নতুন দিন’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এই পত্রিকায় ‘দুই অর্থনীতির প্রয়োজন কেন’ শীর্ষক একটি ধারাবাহিক নিবন্ধ লেখেন। এই বিষয়টি নিয়ে আমি আগেও লিখেছি।
দুই অর্থনীতির দাবিতে বঙ্গবন্ধু যেসব কথা তুলেছিলেন, ১৯৬৬ সালে (পঁয়ষট্টি সালের ভারত পাকিস্তান সতেরো দিনের যুদ্ধের পর) সেগুলোরই সম্প্রসারিত রূপ ছয় দফা। বঙ্গবন্ধু এ সময় আলফা ইনসিওরেন্স নামে একটি ইনসিওরেন্স কোম্পানির জোনাল ম্যানেজার ছিলেন। বর্তমান বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর একটি বহুল ভবনে আলফার অফিসে বসেই আইয়ুবের ঢাকা সফরের সময় তার কাছে এই প্রস্তাবগুলো প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় আমি বঙ্গবন্ধুর খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলাম বলে এসব কথা জানি। রুহুল কুদ্দুস, আবুল আহসান এবং আরো একজন তখনকার তরুণ বাঙালি অফিসার ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাদের মধ্যে রুহুল কুদ্দুস ছিলেন আরো ঘনিষ্ঠ, তারা বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার একটি মাত্র দফা সংযোজন করেন। সেটি কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসে বাঙালি অফিসারদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও পদোন্নয়ন-সম্পর্কিত।
বঙ্গবন্ধু আমাকে এবং ’৭১-এর শহিদ সিরাজুদ্দীন হোসেনকে আলফা অফিসে ডেকে এই দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা করেন এবং তার দাবিগুলো একত্র করে আমি তার নাম দিই ‘শেখ মুজিবের ছয় দফা’। পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খান তখন ঢাকা সফরে আসছিলেন। শোনা গেল, তিনি রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত নিলেন ইত্তেফাকের মানিক ভাইয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে ছয় দফা দাবি আইয়ুবের কাছে তুলবেন।
মানিক ভাই ছয় দফা দাবি ন্যায়সংগত বলে মন্তব্য করেন এবং মুজিব ভাইকে প্রস্তাব দেন, তিনি যেন এককভাবে আইয়ুবের কাছে না তোলেন, বরং পূর্ব পাকিস্তানের সফল রাজনৈতিক নেতার দাবি হিসেবে আইয়ুবের কাছে পেশ করেন। শেখ মুজিব একা দাবিগুলো পেশ করতে গেলে তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দিয়ে আইয়ুব জেলে পুরতে পারেন। বঙ্গবন্ধু মানিক ভাইয়ের প্রস্তাবে রাজি হন এবং মানিক ভাই দায়িত্ব নেন তার বাড়িতে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের প্রবীণ রাজনৈতিক নেতাদের এক রাত্রে গোপন বৈঠকে ডাকবেন। সেখানে ছয় দফা সবাইকে জানানো হবে। মানিক ভাই বঙ্গবন্ধুর সম্মতি নিয়ে তার বাড়িতে মধ্যরাতে এক গোপন বৈঠক ডাকেন। তাতে নূরুল আমিন, হামিদুল হক চৌধুরী, আতাউর রহমান খানসহ সোহরাওয়ার্দী কন্যা বেগম আখতারিও উপস্থিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাদের ছয় দফার কথা জানাতেই তারা আঁতকে ওঠেন। হামিদুল হক চৌধুরী বলেন এই প্রস্তাব দেওয়া হলে আইয়ুব আমাদের সবাইকে জেলে পুরবেন এবং বলবেন আমরা রাষ্ট্রদ্রোহী। পাকিস্তান ভাঙতে চাই। বেগম আখতারি সোলায়মান তো বঙ্গবন্ধুকে অভদ্র ভাষায় সমালোচনা করেন। এই বৈঠক ভেঙে যায়। বঙ্গবন্ধু রেগে গিয়ে বলেন, আপনাদের যখন সাহস নেই, তখন আমি একাই এই দাবি উত্থাপন করব। আমি তখন ইত্তেফাকে কাজ করি। মানিক ভাই আমাকে স্নেহ করতেন এবং এই গোপনে বৈঠকে থাকতে বলেছিলেন বলেই থেকে ছিলাম। এরপর বঙ্গবন্ধু লাহোরে জেনারেল আজম খানের বাসায় অনুষ্ঠিক সর্বদলীয় বৈঠকে ছয় দফা পেশ করেন। আইয়ুব রাগে অগ্নিশর্মা হন। হুমকি দিয়ে বলেন I will face Mujib with language of weapons. আমি অস্ত্রের ভাষায় মুুজিবকে মোকাবিলা করব। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু বলেন, আমি আইয়ুবকে আন্দোলনের ভাষায় (language of Movwment) মোকাবিলা করব। তারপর যা ঘটেছে এখন তা ইতিহাস।
আওয়ামী লীগের তখনকার প্রবীণ নেতারা, যেমন—আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর আহমদ জহিরুদ্দীন, সালম খান প্রমুখ প্রকাশ্যে ছয় দফাকে সমর্থন দেননি। অনেকে ভেবেছিলেন, ইত্তেফাকের মানিক মিয়া ছয় দফা সমর্থন করলেও প্রকাশ্যে তা ব্যক্ত করবেন না। কিন্তু সবার ভুল ধারণা ভেঙে দিয়ে তিনি তার ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ কলামে ছয় দফাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেন। আলফা অফিসে বসে বঙ্গবন্ধু এই লেখাটি পড়েন এবং আনন্দে চিত্কার করে বলে ওঠেন, ‘যা পেয়েছি যা দেখেছি তুলনা তার নেই।’ বঙ্গবন্ধু পাইওনিয়ার প্রেসের মোহাইমেন সাহেবকে ডেকে তখনই মানিক ভাইয়ের লেখাটি ১ লাখ বুকলেট আকারে ছেপে দিতে বলেন এবং গাজি মোস্তফাকে নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগের সব শাখা প্রতিষ্ঠানে তা পাঠিয়ে দিতে। ছয় দফা সমর্থনের জন্য মানিক ভাইকে কঠিন মূল্য দিতে হয়েছিল। আইয়ুব-মোনায়েম সরকার তাকে জেলে নিক্ষেপ করেন। ইত্তেফাকের ভবন বাজেয়াপ্ত করেন। ইত্তেফাকের প্রকাশ নিষিদ্ধ করেন। মানিক ভাই অসুস্থ ছিলেন। দীর্ঘ কারাবাসে আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন। জেল থেকে মুক্তিলাভের কিছুদিন পরেই মাত্র ৫৮ বছর বয়সে প্রয়াত হন। রেখে যান তার ব্যক্তিত্বের সম্প্রসায়িত রূপ দৈনিক ইত্তেফাক। ছয় দফা থেকে বাংলাদেশের যে স্বাধীনতার সংগ্রাম, তাতে মানিক ভাইয়ের অবদানও সবাই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। বঙ্গবন্ধু ও মানিক মিয়া এই দুটি নাম অবিচ্ছেদ্য।
লন্ডন ১৭.৮.২০২০