খালেদা জিয়ার ভাড়া বাড়ি নিয়ে সংকট

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানে রাজধানীর গুলশান ২ নম্বরে যে বাড়িতে ভাড়া থাকছেন সেটি নিয়ে একধরনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ৭৯ নম্বর সড়কের এনইডি-১ নম্বর ‘ফিরোজা’ নামের বাড়িটির মালিক বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেজর (অব.) কামরুল ইসলামের ছেলে তানভীর ইসলাম। মালিকপক্ষের দাবি, ২০১৮ সালের অক্টোবরে বাড়ি ভাড়ার চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরপর চুক্তিও নবায়ন করা হয়নি, তখন থেকে এ পর্যন্ত বাড়ির ভাড়াও অপরিশোধিত। তবে চুক্তি নবায়নের বিষয়ে খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট বিএনপি নেতারা বলছেন, বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী বাড়ির ভাড়া বেশি দাবি করা হচ্ছে। এটা ছাড়াও আরো কিছু জটিলতার কারণে চুক্তি নবায়ন কিংবা নতুন করে চুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না।

২০১০ সালে ঢাকা সেনানিবাসের বাড়ি ছাড়ার কিছুদিন পর খালেদা জিয়া এই বাড়িতে ওঠেন। তখন বাড়ির মালিকের সঙ্গে তিন বছরের চুক্তি করেছিলেন বিএনপি নেতা মোসাদ্দেক আলী ফালু। কয়েক দফায় চুক্তি নবায়ন করা হয়।   ২০১৮ সালের অক্টোবরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে ফালু আর চুক্তি নবায়ন করেননি। চুক্তির মেয়াদ থাকতেই ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যান খালেদা জিয়া।

মেজর (অব.) কামরুল ইসলাম ইত্তেফাককে জানান, খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ারও বেশ কিছুদিন পর তিনি বিষয়টি নিয়ে খালেদা জিয়ার ভাই শামীম এস্কান্দার ও তার স্ত্রী, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেন। তারা কেউই কোনো সিদ্ধান্ত জানাতে পারেননি।

এ বছরের ২৫ মার্চ কারাগার থেকে বের হয়ে খালেদা জিয়া এই বাড়িতেই ওঠেন। বাড়ির মালিকের সঙ্গে ভাড়ার চুক্তির বিষয়টি ফয়সালা করতে তিনি দায়িত্ব দেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টুকে। দায়িত্ব পেয়ে মিন্টু কয়েক দিন কামরুল ইসলামের সঙ্গে কথাও বলেন। এখন বাড়ির মালিকপক্ষের অভিযোগ, বর্তমানে বাড়ির বকেয়া ভাড়া ও চুক্তির বিষয়ে বিএনপির কেউ দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসছেন না।

এ ব্যাপারে মিন্টু ইত্তেফাককে বলেন, ‘২০১৮ সালের অক্টোবর নয়, মূলত চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ভাড়া বকেয়া। চুক্তি নবায়নের বিষয়ে আমি একাধিকবার কথা বলেছি। কিন্তু বাড়ির মালিকপক্ষ বর্তমানে যে ভাড়া দাবি করছেন সেটি বাজারদরের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়াও আরো কিছু জটিলতা রয়েছে। যার কারণে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগছে।’

মিন্টু জানান, ভাড়া যখন বকেয়া হতে শুরু করেছে তখন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের তহবিল থেকে টাকা পরিশোধের প্রস্তাব দিয়েছিলেন মালিকপক্ষকে। কিন্তু বাড়ির মালিক দলীয় তহবিল থেকে টাকা নিতে রাজি হননি। এ ব্যাপারে কামরুল ইসলামের বক্তব্য, ‘হ্যাঁ এটা সত্য যে, বিএনপি মহাসচিব আমাদেরকে এ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে কোনো চুক্তি ছাড়া একটি রাজনৈতিক দলের তহবিল থেকে টাকা নিলে পরবর্তীকালে আইনি সমস্যাসহ নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে আমরা এ প্রস্তাবে সায় দিইনি।’

খালেদা জিয়া যে বাড়িটিতে বর্তমানে বসবাস করছেন সেটির পাশের বাড়িটিই (১৯৬ গুলশান এভিনিউ) তার নিজের। সরকার থেকে পাওয়া দেড় বিঘার বাড়িটি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানির (বিএটিসি) কাছে ভাড়া দিয়ে রেখেছেন খালেদা জিয়া। বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতাদের ও খালেদা জিয়ার বর্তমানে বসবাস করা ভাড়া বাড়ির মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মালিকপক্ষের মধ্যে এমন একটি আশঙ্কা জন্মেছে যে, ভবিষ্যতে বাড়িটি হয়তো তাদের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।

খালেদা জিয়ার অবর্তমানে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মীদের থাকার জন্য চার কক্ষের একটি অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। এই স্থাপনা নির্মাণ করা হয় বিএটিসির কাছে ভাড়া দেওয়া খালেদা জিয়ার নিজের বাড়িতে। তবে সেখানে পানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ নেওয়া হয়েছিল পাশের ভাড়া বাড়ি থেকে (যেটিতে খালেদা জিয়া বসবাস করছেন)। এজন্য দুই বাড়ির মাঝখানের দেয়ালও কিছুটা ভাঙা হয়। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর কামরুল ইসলাম সেসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরবর্তীকালে ওই অস্থায়ী স্থাপনাও সরিয়ে নেওয়া হয়।

সৃষ্ট জটিলতা সম্পর্কে কামরুল ইসলাম বলেন, ‘ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) ওঠার আগে বাড়িটি ভাড়ার জন্য আমাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল ইন্টারন্যাশনাল ক্লাবের সঙ্গে। তখনকার পরিস্থিতিকে মানবিক হিসেবে বিবেচনা করে আমরা ইন্টারন্যাশনাল ক্লাব কর্তৃপক্ষকে চুক্তি বাতিলের অনুরোধ করি, এমনকি তাদের দেওয়া অগ্রিম টাকাও ফেরত দিই। কিন্তু বর্তমানে চুক্তিহীন অবস্থায় থাকায় আমাদেরকে কিছু আইনি জটিলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সিটি করপোরেশনকে বছরে ১ লাখ ১৯ হাজার টাকা কর দিতে হয়; পানি-বিদ্যুত্-গ্যাসের বিল দিতে হয়; কিন্তু চুক্তিহীন ও ভাড়া বকেয়া থাকায় এসব পরিশোধে আইনি সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া তানভীরের আরকর ফাইলেও সমস্যা হচ্ছে, কারণ আয়কর ফাইলে বাড়ি থেকে প্রাপ্ত ভাড়া প্রদর্শন করা যাচ্ছে না।’