অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, বাংলাদেশে ঝুঁকি কতটা?

লেবাননের বৈরুতে বিস্ফোরিত হওয়া অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বাংলাদেশেও আমদানি হয়। সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে ৯০০ টন আমদানি হয়েছে। বর্তমানে ৩০০ টনের মতো মজুতও আছে। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের বিস্ফোরণের সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ জঙ্গলের মধ্যে বিশেষ গুদামে এগুলো মজুত রাখা হয়।

বাংলাদেশে মূলত দিনাজপুরের কয়লাখনিতে বিস্ফোরণে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের ব্যবহার বেশি। গত বছর দেশে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ব্যবহারে নতুন আইন হয়েছে, যেটা লেবাননে নেই। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এ ধরনের আইন আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা মূলত সার। কিন্তু বাংলাদেশে এই সার ব্যবহার হয় না। কিছু ওষুধ তৈরি আর কয়লাখনি ছাড়া অন্য কোথাও এর তেমন ব্যবহার নেই।

ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহম্মেদ খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘২০১৭ সালে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বিসিআইসির ফ্যাক্টরি ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) কারখানায় অ্যামোনিয়া প্ল্যান্টে বিস্ফোরণ হয়েছিল। এটা চাইনিজ প্ল্যান্ট ছিল। এ বিস্ফোরণে ৪৫ জনের মতো অসুস্থ হন। মরে যায় পাশের পুকুরের সব মাছ। নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের পর আমরা কিন্তু এটা নিষিদ্ধ করতে পরামর্শ দিয়েছিলাম।

লেবাননের ঘটনার পর আমি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে এটা নিয়ে কথা বলেছি। অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে তেমন ঝুঁকি নেই বলে মনে হলেও এটা ব্যবহারে আমাদের আরো বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশে কোনো কিছু ঘটলে ব্যাপক আলোচনা হয়। কিছুদিন পর সেই আলোচনা থেমে গেলে সব প্রক্রিয়াও থেমে যায়। এ কারণে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে শক্ত হতে হবে। বিষয়টি বিশেষ নজরদারিতে রাখতে হবে।

দীর্ঘদিন ধরে বিস্ফোরক নিয়ে গবেষণা করছেন এমন এক জন সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিচয় না প্রকাশের শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট মূলত সার। তবে আমাদের দেশে এটি সার হিসেবে ব্যবহার হয় না। পেট্রোবাংলার দুটি প্রতিষ্ঠান কোল্ড মাইনিং ও হার্ডড্রগ মাইনিং মূলত এটি আমদানি করে। কয়লা ভাঙার জন্য এটা ব্যবহার করা হয়। আমাদের দেশে শতভাগ ‘রুলস রেগুলেশন’ মেনেই এটি আমদানি করা হয়।

অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট আমদানি বা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এতদিন দেশে কোনো আইন ছিল না। গত বছর এ আইনটা করা হয়েছে। ভারত ও ব্রিটেনের আইনের সমন্বয়ে এটা করা হয়েছে। লেবাননে এই ধরনের কোনো আইন নেই। যে কারণে পোর্টে তারা রাখতে পেরেছে। আমাদের দেশে পোর্টের তিন কিলোমিটারের মধ্যে এই বিস্ফোরক বহন করা জাহাজ ভিড়তে পারবে না। আনলোডও করতে হবে তিন কিলোমিটার দূরে। জাহাজ থেকে নামার পর সোজা পুলিশি পাহারায় দিনাজপুর চলে যায়।

এই বিশেষজ্ঞ জানান, হার্ড ডগ মাইনিং ও কোল্ড মাইনিংয়ের জন্য আমদানি করা অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট দিনাজপুরের দুটি গুদামে রাখা হয়। দুটি গুদামই জঙ্গলের মধ্যে, যাতে বিস্ফোরণ ঘটলেও মানুষের কোনো ক্ষতি না হয়।

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের ইন্সপেক্টরের দায়িত্বরত জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. মঞ্জুরুল হাফিজ ইত্তেফাককে বলেন, লেবাননের মতো বিস্ফোরণের সম্ভাবনা বাংলাদেশে কম। গত জুলাই মাসের শেষে বাংলাদেশে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট মজুত ছিল ৩০০ টনের মতো। গত অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ৯০০ টন। এর মধ্যে হার্ডড্রগ কোম্পানির কাছেই মজুত আছে ১৫০ টন। এছাড়া স্পেকট্রা, ইসলাম অক্সিজেন ও ডিআইজিএল নামে তিনটি প্রতিষ্ঠান ওষুধ তৈরির জন্য সীমিত পরিসরে এটা আমদানি করে। সরকারি এই দুই প্রতিষ্ঠানের বাইরে বড় আকারে আমদানি খুব একটা হয় না।

পুরান ঢাকায় এই ধরনের বিস্ফোরক নেই জানিয়ে মঞ্জুরুল হাফিজ বলেন, ‘পুরান ঢাকায় যা আছে তা কেমিক্যাল। সব কেমিক্যালই বিস্ফোরক নয়। তবে আগুন লেগে গেলে কোনো কোনো কেমিক্যাল বিস্ফোরকে রূপান্তরিত হয়। যেমন কোনো অক্সিজেন সিলিন্ডার পুড়লে সেটাও বিস্ফোরক হয়ে যায়। মশা মরার স্প্রে, বডি স্প্রেসহ বিভিন্ন ধরনের পারফিউমে দাহ্য কেমিক্যালের ব্যবহার হয়। ফলে পুরান ঢাকা আগুনের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।’

অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটে শঙ্কা কেন? সাধারণত কৃষিতে সার হিসেবে ব্যবহার করা হলেও বিস্ফোরক হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু শুরুর দিকে এটি বিস্ফোরক হিসেবে ব্যবহার হতো না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে একে প্রথম বিস্ফোরক হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। যুদ্ধের সময় টিএনটি ডিনামাইটের সঙ্গে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট মিশিয়ে সৈনিকেরা সস্তায় বোমা তৈরি করত, যা ডিনামাইটের চেয়ে অনেক বড় বিস্ফোরণ ঘটাত।

অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট নিজে নিজে জ্বলতে পারে না। কিন্তু এই যৌগটি বিস্ফোরণে অবদান রাখতে পারে। কারণ এটি এমন একটি রাসায়নিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, যা অক্সিডাইজার (জারক) হিসেবে পরিচিত। যখন কোনো কিছু জ্বলে তখন তার অক্সিজেন প্রয়োজন হয়। এজন্য আগুন নেভানোর যন্ত্রগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে অক্সিজেন সরবরাহ না হয়। কিন্তু অক্সিডাইজার এর বিপরীত কাজ করে। এগুলো জ্বলন্ত বস্তু এবং এর আশপাশে অক্সিজেনের অণুর পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে অন্য পদার্থগুলোও আরো অগ্নিদাহ্য হয়ে ওঠে। যে কোনো কার্বনসমৃদ্ধ জ্বালানি যেমন—কাগজ, কার্ডবোর্ড, এমনকি চিনি অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের সঙ্গে জুড়ে গেলে এটি বড় বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। বিপুল পরিমাণে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট এক জায়গায় স্তূপ করে রাখলে তা থেকে বড় বিস্ফোরণ ঘটার সম্ভাবনা অনেক বেশি।