চুরির সম্মোহন কে ভাঙাইবে?

 ‘অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি/ জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি।’ লিখিয়াছিলেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তখন ব্রিটিশ ভারত ছিল স্বদেশি আন্দোলনে উত্তাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পৃথিবী উত্তাল। কিন্তু এখন একটি শিশু বাংলাদেশে জন্মাইবার পর কী দেখিতে পায়? চুরি আর দুর্নীতির অভয়ারণ্য। মনস্তত্ত্ববিদরা বলিয়া থাকেন, মানুষের মনোবিকাশে শৈশব ও কৈশোরের গুরুত্ব অপরিসীম। যেই শিশু বা কিশোর দেখিতেছে যে, তাহার পিতা অনিয়ম-দুর্নীতি করিয়া অর্থের পাহাড় তৈরি করিতেছে, তাহার মধ্যে কী করিয়া নীতিবোধ তৈরি হইবে? অথচ আমাদের আদর্শলিপি কিংবা ধর্মগ্রন্থসমূহে সত্পথে চলিবার এবং চুরি না করিবার অসংখ্য নীতিবাক্য রহিয়াছে। এই জাতির প্রায় সকলের কর্মফল ও আখিরাত উভয় জগত্ লইয়া বিশ্বাস রহিয়াছে। দুর্নীতি কিংবা চুরি করা অর্থ তো হারাম। কোনো ব্যক্তি যদি হারাম কোনো বস্তুকে হারাম মনে করিয়া গ্রহণ করেন, তবে তাহার কবিরা গুনাহ হইবে। আবার যদি হারাম বস্তুকে হালাল মনে করিয়া গ্রহণ করেন, তবে পরিণতি হইবে আরো ভয়াবহ। আখিরাতে সরাসরি জাহান্নাম।

আমরা শৈশবে পড়ি, অনেস্টি ইজ দ্য বেস্ট পলিসি। ইহা এখনো শিখানো হয় বটে, কিন্তু তাহা যেন সুযোগের অভাবে সত্ থাকিবার মতো। কেহ যদি বলেন অমুক লোকটি সত্। তখন পালটা বলা হয়, কত টাকা পর্যন্ত তাহার সততার সীমা? কিংবা বলা হয়, লোকটি সুযোগের অভাবে সত্। অর্থাত্ সুযোগ পাইলে রাক্ষসের মতো অর্থ গিলিবে, চুরি করিবে। কেন এমন দুঃসহ মনস্তত্ত্ব এই জাতির মধ্যে গাঁথিয়া গেল? চুরির ব্যাপারে আমরা যেন সম্মোহিত জাতিতে পরিণত হইয়াছি। প্রায় প্রত্যেকের মতো এক-একটি শিয়াল আর বকধার্মিক বসবাস করে। শিয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি। চুরি করিয়া এই সমাজে অধিকাংশেরই সম্মান-প্রভাব বাড়ে বই কমে না। চুরির নীরব হাতেখড়ি তো সেই কৈশোরে অন্যের গাছের আম, লিচু, খেজুরের রস চুরি করিবার মধ্যদিয়া ঘটিয়া যায়। এই সকল চুরি তখন গর্বের, সাহসের। এই সকল চুরির গল্প যাহাদের থাকে না তাহারাই বরং হীনম্মন্যতায় ভোগেন। সরকারি অফিসের সাধারণ কর্মচারীর ছেলের চেহারা যখন অর্থের পলিশে চকচক করে, তখন তাহার প্রতিবেশী মেধাবী বেসরকারি চাকুরে বন্ধুরও বুক চিরিয়া দীর্ঘশ্বাস বাহির হয় ঘুষ খাইবার ‘ড্রয়ার’ না পাইবার দুঃখে। এই বাঙালিই আবার রাস্তায় চোর পাইলে তাহাকে দুই ঘা দিতে দ্বিধা করে না। কিন্তু পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ রহিয়াছে, যেইখানে শিক্ষা ও সভ্যতার বোধ অধিক বিধায় নাগরিকগণ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে কখনো বিস্মৃত হন না। সভ্য দেশের মানুষ মধ্যরাত্রে গাড়ি চালাইবার সময়েও ট্রাফিক সিগন্যাল মানিয়া চলেন, তাহাদের শিক্ষা ও বিবেকই তাহাদের আইনরক্ষক। দোকানে কেহ না থাকিলেও তাহারা দ্রব্য লইয়া যথোচিত মূল্য ফাঁকা কাউন্টারেই রাখিয়া আসে।

সুতরাং সততাকে আমাদের সংস্কৃতির মধ্যে প্রবেশ করাইতে হইবে। আর সেই সংস্কৃতির শিক্ষা পরিবার ও সমাজ হইতেই মানুষ পাইয়া থাকে। জাতি হিসাবে আমাদের দৈন্য ঘুচাইতে হইলে সততার সংস্কৃতিকে ধারণ করিতেই হইবে।