জন্মদিনের আলাপচারিতায় বেবী নাজনীন

‘নিশ্চয়ই আমরা আগের পৃথিবী ফিরে পাবো’

খা লে দ  আ হ মে দ

 

‘কৃষ্ণহীরক’ কিংবা ‘ব্ল্যাক ডায়মন্ড’—এই উপাধিগুলো শুনলেই বোঝা যায় কথা হচ্ছে বেবী নাজনীনকে ঘিরে। বাংলাদেশের স্বনামখ্যাত সংগীত তারকা তিনি। আধুনিক বাংলা গানের বাজারে রয়েছে যার সর্বাধিক সংখ্যক একক (৫০টি একক এবং দু’শরও বেশী মিক্সড) ও মিক্সড অ্যালবাম। আগামী ২৩ আগষ্ট এই তারকার জন্মদিন। এই মূহুর্তে তিনি অবস্থান করছেন আমেরিকার নিউ ইয়র্কে। গত মার্চেই তার ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে নিউ ইয়র্ক লকডাউন হওয়ায় ঢাকায় আর ফেরা হয়নি। মুঠোফোনে জানান, আর জন্মদিন! প্রতিদিন এখন খারাপ খবর দিয়েই সকাল শুরু হয়। দেশ, অন্যদেশ কিংবা আমেরিকার অন্য শহর থেকেও কমবেশি দুঃসংবাদ পাই সারাদিন। ফোন বাজলেই মনে হয় আবারও একই খবর কি না?  বদলে গেছে পৃথিবীর চেহারা। এমনটি হতে পারে চিন্তা করতে পারিনি কোনোদিন। মাঝেমধ্যে টুকটাক বাজার সদাই করা ছাড়া ঘরের বাইরে যাওয়া হয় না। ছেলে মহারাজ অনলাইনে পড়াশোনা করে। আমার সময় কাটে নিউজ দেখে, এটা সেটা রান্না করে, নামাজ পড়ে, কোরআন শরিফ পড়ে আর পরিবার বন্ধু ও আপনজনদের খোঁজ খবর নিয়ে। এসব করেই কাটছে বিগত কয়েক মাস। কবে দেশে যেতে পারব বলতে পারছি না। আপনারা দোয়া করবেন এবং ভালো থাকবেন। মহান আল্লাহ চাইলে নিশ্চয়ই আমরা আগের পৃথিবী ফিরে পাব ইনশাল্লাহ।

বাংলাদেশ বেতার, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন এবং মঞ্চ মাধ্যমের অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং লাখো শ্রোতার হূদয়ে প্রভাব বিস্তারকারী একজন গানের শিল্পী তিনি। ‘ব্ল্যাক ডায়মন্ড’ নামে যার খ্যাতি ছড়িয়েছে দেশ ছাড়িয়ে উপমহাদেশ এবং বিদেশেও। গানের মাধ্যমে সরকারি এবং বেসরকারিভাবে পৃথিবীর বহু দেশে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন বহু বছর ধরে। যে কারণে বিভিন্ন ভাষার গানও তাকে রপ্ত করতে হয়েছে। এক কথায় একজন বহুমাত্রিক গানের শিল্পী তিনি। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন একাধিকবার দেশ এবং বিদেশের অনেক সম্মান-সম্মাননা অর্জন করেছেন সংগীত জীবনে। আধুনিক গানের বাইরে রবীন্দ্র-নজরুল, লালন, পল্লিগীতি ও ভাওয়াইয়া গানে ব্যাপক দখল রয়েছে তার। হিন্দী-উর্দু গান আর গজলেও সমান শক্তিমান এক কণ্ঠের নাম বেবী নাজনীন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্টেইজে সেসব গুণের সাক্ষরও তিনি রেখেছেন চল্লিশ বছরের সংগীত জীবনে। আসলে একজন প্রকৃত শিল্পীকে সব ঘরানার গানেই পারদর্শী হতে হয়। বাংলাদেশের হাতেগোনা যে দু’তিনজন সংগীতশিল্পী গানের বিভিন্ন ধারায় বিচরণ করে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন বেবী নাজনীন তাদের মধ্যে অন্যতম। ভার্সেটাইল গানের এই সিঙ্গার বলেন, আসলে কোন গান কোথায় গাইব এটা নির্ভর করে কোন ধরনের গানের শ্রোতার সামনে আমি উপস্থিত রয়েছি। নিজেকে সেভাবেই প্রস্তুত করতে এবং রাখতে হয়। একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা হলো মঞ্চ। এটি একটি কঠিন জায়গা। যেখানে বিভিন্ন রকমের মানুষের সমাগম ঘটে। তাদের পছন্দও হয় বিভিন্ন রকম। নানা রকমের গানের অনুরোধ আসবে, তখন যদি আপনি নিজেকে সেই পছন্দ অনুযায়ী উপস্থাপন করতে না পারেন তাহলে দর্শক-শ্রোতার কাছে আপনার আলাদা কোনো অবস্থান তৈরি হবে না। অথচ এই অবস্থানটিই আপনাকে শিল্পী হিসেবে সবচেয়ে বেশী এগিয়ে নেবে। গান গাইতে হলে বিভিন্ন ধারার গানের সঠিক চর্চা থাকতে হবে অবশ্যই।

এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম এবং বেড়ে ওঠা বেবীর গানের হাতেখড়ি তার বাবা সংগীত ব্যক্তিত্ব মনসুর সরকারের কাছে। তারপর জীবনের দীর্ঘ চলারপথে সংগীতের নানা দীক্ষা এবং সাধনায় যেন নিজেই নিজেকে গড়ে তুলেছেন বেবী নাজনীন। আর সেই দিক থেকে বিবেচনা করলে বেবী নাজনীন একজন ‘সেলফ মেইড’ সংগীত তারকা।

১৯৮০ সালে এহতেশাম পরিচালিত ‘লাগাম’ চলচ্চিত্রে আজাদ রহমানের সুর ও সংগীতে আহমেদ জামান চৌধুরীর লেখা একটি গানের মাধ্যমে চলচ্চিত্রের গানে অভিষেক ঘটে বেবী নাজনীনের। আর ১৯৮৭ সালে মকসুদ জামিল মিন্টুর সংগীত পরিচালনায় সারগাম থেকে প্রকাশিত প্রথম অ্যালবাম ‘পত্রমিতা’ বেবী নাজনীনের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুড়িয়ে দেয়। সংগীতপ্রিয় সব মানুষের মনে তিনি যেন এক স্থায়ী আসন তৈরি করে নেন সেই অ্যালবাম দিয়েই। তারপর ‘কালসারা রাত’, ‘প্রেম করিলেও দায়’, ‘দুচোখে ঘুম আসে না’— শিরোনামের অ্যালবামগুলো আধুনিক গানের বাজারে বেবী নাজনীনকে জনপ্রিয় এবং সর্বত্রই গ্রহণযোগ্য শিল্পী হিসেবে চিহ্নিত করে। সেই রংধনু থেকে, কাল সারা রাত ছিল স্বপনেরও রাত, এলোমেলো বাতাসে উড়িয়েছি শাড়ির আঁচল, দু’চোখে ঘুম আসে না তোমাকে দেখার পর, আমার ঘুম ভাঙ্গাইয়া গেলো রে মরার কোকিলে, মানুষ নিষ্পাপ পৃথিবীতে আসে, কই গেলা নিঠুর বন্ধুরে-সারা বাংলা খুঁজি তোমারে, পূবালী বাতাসে, ও বন্ধু তুমি কই কই রে... এমন অনেক কালজয়ী গানের শিল্পী বেবী নাজনীন লেখক হিসেবেও সুনাম অর্জন করেছেন। তার নিজের অনেক গান তিনি নিজেই লিখেছেন, সুরারোপও করেছেন। তার লেখা ‘সে’, ‘ঠোঁটে ভালবাসা’ এবং ‘প্রিয়মুখ’ শিরোনামে তিনটি কাব্যও প্রকাশিত হয়েছে। এখন লেখালেখির তেমন একটা সময় পান না বলে জানালেন তিনি। তার সর্বশেষ একক অ্যালবামটি ‘ব্লাক ডায়মন্ড বেবী নাজনীন’ শিরোনামে।