হাসান ইমাম
গোয়েবলসের কথা মিথ্যা নয়, বরং স্বার্থ ও একচোখা নীতির মিশেলে তৈরি উত্তরাধুনিক বাস্তবতায় তা আরো বেশি ‘সত্য’। ইসরাইলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের চুক্তিকে তাই বিশ্বাসঘাতকতা, পিঠে কিংবা সিনায় ছুরি মারা—যেভাবেই উপলব্ধি করুক ফিলিস্তিনিরা, ‘সভ্যতা’র কিছুমাত্র রক্তক্ষরণ ঘটে না তাতে। আরব শাসকদের চারিত্রিক শঠতা, মজ্জাগত চাতুরি অনুধাবন করতে না পারার ব্যর্থতা তাদের। ফিলিস্তিনের বিবর্ণ ভবিষ্যতের দিকে আর কারো নজর থাকবে, সেই ভরসা কম। এত দিন ইসরাইলি বাহিনীর হাতে নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের বেঘোরে প্রাণহানি, নিজ ভূমি থেকে তাদের উচ্ছেদের বিষয়টি কমবেশি আলোচনায় থাকলেও আগামী দিনে এসবের সংবাদমূল্য কমবে। মিথ্যা বারবার বলতে বলতে একসময় তা ‘সত্য’ হয়ে যায়। ফিলিস্তিনের দুঃখ-দুর্দশা দেখতে দেখতে গোয়েবলসদের চোখ সওয়া হয়ে গেছে। ইসরাইলের সঙ্গে আমিরাতের চুক্তি তারই পাকা পয়গাম।
১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের যে প্রস্তাব অনুসারে ইসরাইল রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন, সেই একই প্রস্তাবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রেরও আত্মপ্রকাশ করার কথা। সাত দশকে ইসরাইল বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর দেশ হিসেবেই কেবল নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেনি; ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার বিষয়টিকে দূর গ্রহের ইস্যু বানিয়ে ছেড়েছে। ইসরাইলের দখলদারিত্বে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার জোগাড়। যেটুকু যা-ও খণ্ড খণ্ড টিকে আছে, তা-ও ছাদখোলা কয়েদখানায় পরিণত। চৌপ্রহর ইসরাইলি সেনাদের রক্তচক্ষু প্রহরা, অর্ধেক আকাশ ঢেকে দেওয়ার সমান উচ্চতার অভেদ্য দেওয়াল, পথে পথে তল্লাশি চৌকি, এমনকি এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতেও লাগে ইসরাইলের অনুমতি। অর্থাত্, স্বায়ত্তশাসন বস্তুটি আর কাগজেও টিকে নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থার মধ্যে হওয়া শান্তিচুক্তির ভিত্তিতে ১৯৯৬ সালে পশ্চিম তীর ও গাজায় ফিলিস্তিনি স্বায়ত্তশাসন কায়েম হয়। যদিও ততদিনে ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডের বড় অংশ ইসরাইলের অবৈধ বসতির কবলে, সামরিক কবজায়। সুতরাং, একে কাগুজে স্বায়ত্তশাসন বলাই দস্তুর; সেটুকুও এখন প্রায় অবসিত। কিন্তু স্বায়ত্তশাসনের সেই প্রশাসনও দুই খণ্ড হলো ২০০৬ সালে। পশ্চিম তীর গেল ফাতাহর নিয়ন্ত্রণে, ইসলামিক ব্রাদারহুডের মিত্র হামাসের কাছে থাকল গাজা। এবং এই দুজন একে অপরকে এতটুকু সহ্য করতে পারে না; মুখ দেখাদেখি বন্ধ, যখন-তখন একে অপরের দিকে তেড়ে যায় অস্ত্র হাতে। তাই দেখে মুচকি মুচকি হাসে ইসরাইল ও পশ্চিমারা। হামাস যেহেতু ইসরাইলের অস্তিত্বই স্বীকার করে না, সুতরাং পশ্চিমারা দলটির সঙ্গে সব সম্পর্ক বর্জন করে। ‘সন্ত্রাসবাদী’ তকমা থাকায় হামাসের ওপর যখন-তখন হামলা চালিয়েও পশ্চিমাদের বাহবা কুড়ায় ইসরাইল, যদিও সেই সব হামলার লক্ষ্য শুধু হামাস থাকে না। নারী, শিশু, বৃদ্ধ—কেউ রেহাই পায় না ইসরাইলি বাহিনীর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র, বোমা-বারুদ, গুলি-গোলার নিশানা থেকে। তবু মুখে রা কাড়ে না কেউ। সুতরাং হামাস-ফাতাহ কাজিয়া না মিটলে শান্তিচুক্তি সম্ভব—এ কথা ফিলিস্তিনিরাও বিশ্বাস করে না। কিন্তু তাদের এই বিশ্বাস ছিল, দশকের পর দশক ধরে চলে আসা ইসরাইলি আগ্রাসন, দখলদারিত্ব, নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে অন্তত আরব বিশ্ব সরব থাকবে। ১৯৪৮ সালে আরব দেশগুলো একজোট হয়েওছিল; আজ তারাই ইসরাইলের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে।
ফিলিস্তিন বিপর্যয়ের প্রধান কারণ আরব শাসকদের ইসরাইলের পক্ষাবলম্বন। কার্যত তারা ইসরাইলকে আঞ্চলিক নেতা হিসেবেই স্বীকৃতি দিচ্ছে এখন। এ ক্ষেত্রে আজদাহা ভূমিকাটি সৌদি আরবের, ইসরাইলের বেহদ বিশ্বস্ত বন্ধু। পরে একে একে এই কাতারে শামিল মিশর ও উপসাগরীয় দেশগুলো। তারাও হামাস, ফাতাহ আন্দোলন, পিএলও, হিজবুল্লাহকে নিজেদের শত্রু হিসেবে দাগিয়ে দিচ্ছে। ইরান তো বরাবরই তাদের অভিন্ন হুমকি। ট্রাম্পের ‘শতাব্দীর চুক্তি’ মানতে নারাজদের প্রতি কেবল নাখোশিই নয়, পারলে পালটা পদক্ষেপ নেয় সৌদিসহ আরব রাষ্ট্রগুলো।
জায়নবাদীদের প্রিয় শাসক মিশরের প্রেসিডেন্ট জেনারেল সিসি। তাকে দেখে সৌদি যুবরাজ বিন সালমান রপ্ত করেছেন ইসরাইলের সহায়তায় কীভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে হয়। ইরানকে চাপে রাখতে ইসরাইলের নেতৃত্বে জোট গঠনও আর অসম্ভব নয়, এমন কথাও বলছেন কেউ কেউ। ইতিহাসের পাতা থেকে তারা তুলে আনছেন এই সত্য, মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই জায়নবাদীদের পক্ষে কাজ করছেন আরব শাসকেরা। অটোমানদের পতন ঘটানো ছাড়া ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা সম্ভব ছিল না। অটোমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে জায়নবাদীসহ পশ্চিমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ করে আরবরা।
সুতরাং আরব শাসকদের ভোল পালটানোয় ফিলিস্তিনিদের বেদনাহত হওয়ার কিছু নেই। স্বার্থের সমীকরণে সভ্যতার যে কদর্য রূপটি তাদের সামনে দৃশ্যমান, তার তর্জমায় দাঁড়ায় তাদের দুর্বিষহ অতীত, অসহনীয় বর্তমানের ভার একান্তই তাদের। কিন্তু তাদের এত লহু এত কান্নার সামনে দাঁড়ানোর মতো তাকত কি এমন সভ্যতার আছে?
n লেখক :সাংবাদিক