ছয় মাসের অধিক সময় ধরিয়া সকল ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। আর ইহাতে সবচাইতে অধিক ক্ষতি হইতেছে শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের। গত ১৬ মার্চ হইতে স্কুল বন্ধ ঘোষণা হইবার পর একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলিয়াছিলেন—সেপ্টেম্বরের পূর্বে বিদ্যালয় খুলিবার সম্ভাবনা নাই। এই মহামারির মধ্যেই এখন প্রায় সকল ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মানিয়া কর্মচাঞ্চল্য ফিরাইয়া আনা হইয়াছে। ইহা নিউ নরমাল। সম্প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়েও বেশ কিছু নির্দেশনা তৈরি করিয়াছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। তাহাতে মনে করা হইতেছে, আগামী মাসে কিছু বিশেষ নিয়ম মানিয়া বিদ্যালয় খুলিয়া দেওয়া হইতে পারে।
কিন্তু বিদ্যালয় খোলা উচিত কি না এবং না খুলিলে শিশুদের কতটা ক্ষতি হইতেছে—তাহা অনুধাবনের চেষ্টা করা যাইতে পারে। ইহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, দীর্ঘ ছয় মাস এই অস্বাভাবিক বিরতিতে শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে তেমনি তাহারা মানসিকভাবেও ভালো নাই। সবচাইতে অধিক নেতিবাচক প্রভাব পড়িতেছে প্রাথমিক পর্যায়ের শিশু শিক্ষার্থীদের উপর। কারণ যেই বয়সটিতে শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে, সেই সময় তাহাদের সামাজিকতা শিখিবার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুলে বিভিন্ন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সহিত মিলামেশা, নানা ধরনের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাহাদের সমাজের সহিত পরিচিত হইতে সাহায্য করে। খোলা বাতাসে ঘরের বাহিরের আনন্দ হইতে তাহারা বঞ্চিত হইতেছে। এখন অবশ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলিয়া দেওয়ার পর আর পূর্বের চিত্র থাকিবে না। অর্থাত্ শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মানিয়া চলিতে হইবে। অনেক প্রতিষ্ঠানের একটি শ্রেণিতে ৬০ হইতে ৭০ জন ছাত্রছাত্রী রহিয়াছে। একটি বেঞ্চে পাঁচ জনও বসিয়াছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে ক্লাসের এক-তৃতীয়াংশ বা একটি ক্লাসের ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বসাইবার কথা জানা গিয়াছে। সেই ক্ষেত্রে রোস্টার করে শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রমে আনিবার সুপারিশ করা হইয়াছে।
কিন্তু ইহার বিপরীতে বলা যায়, যেইখানে বড়রা এই মহাসংক্রমণ রোগের বিরুদ্ধে খুব অধিক সচেতন নন, সেইখানে শিশুরা কতখানি তাহা ঠিকমতো অনুসরণ করিতে পারিবে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সম্প্রতি প্রকাশ করা ৩৩তম সাপ্তাহিক প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের গতি এখন ঊর্ধ্বমুখী। স্বাস্থ্যবিধি-সামাজিক দূরত্ব মানিবার কথা বলা হইলেও বাস্তবে এইগুলি এখন আর কার্যকর নাই বলিলেই চলে। যদিও এখন পর্যন্ত বিশেষজ্ঞরা মনে করিতেছেন, করোনা ভাইরাস বড়দের জন্য যতখানি প্রাণঘাতী, শিশুদের ততটা নহে। তবে শিশুরা নীরবে ইহার বাহক হইয়া থাকে এবং বড়দের মধ্যে ছড়াইতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাহা ছাড়া করোনার জন্য যদি একটি শিশুরও ক্ষতি হইয়া থাকে, তাহার দায় কে লইবে? বিশ্বের যেই সকল দেশে করোনার সংক্রমণের বাংলাদেশের কাছাকাছি সেই সকল কোনো দেশই তাহাদের বিদ্যালয় খুলিয়া দেয় নাই। দুই-একটি ক্ষেত্রে খুলিয়া দেওয়া হইলেও শিক্ষার্থীদের ভিতরে নূতন সংক্রমণে বিদ্যালয় বন্ধ করিয়া দিতে বাধ্য হইয়াছে। এমনকি ১৩৫ কোটির বৃহত্তর দেশ ভারতেও সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রহিয়াছে। কবে খুলিবে, তাহা অনিশ্চিত। আমরা মনে করি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলিয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বের সচেতন দেশগুলির দিকে লক্ষ রাখিয়া এই কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।