কোভিড-১৯-এর মহামারি অবস্থায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলবে কি না—এ বিষয়ে সবাই আমরা অন্ধকারের মধ্যে আছি। শিক্ষার্থীরাও একটা টানাপোড়েনের মধ্যে আছে। প্রতিটি মানুষের জীবন অনেক মূল্যবান, অনেক সম্ভাবনাময়। যেহেতু করোনা এযাবত্কালের একটি ভয়াবহ সংক্রামক ভাইরাস সেহেতু এটাকে পরিকল্পিতভাবেই মোকাবিলা করা উচিত।
এটা অনেকটা পরিষ্কার যে হঠাত্ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে না, সেই সঙ্গে এটাও আমরা কাম্য মনে করি না যে, আমরা দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ রেখে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে দূরে থাকব। প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়কে ভাবতে হবে এবং নিজস্ব পরিকল্পনা বের করতে হবে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগ অনলাইন ক্লাস শুরু করে দিয়েছে। অনেক শিক্ষার্থীই বলা যায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করছে। এটা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক, যদিও অনেক ছাত্রছাত্রী অনুপস্থিত থাকছে। অংশগ্রহণকারী ছাত্রছাত্রীরা অনেক আগ্রহী, উচ্ছ্বসিত ও আন্তরিক। শিক্ষক হিসেবে আমরাও অনেকেই অনলাইন ক্লাস আনন্দের সহিত চালিয়ে যাচ্ছি। BDREN ও ZOOM-কে অনেক ধন্যবাদ এবং সরকারের যারা এ বিষয়ে যুক্ত আছেন তাদেরও অনেক ধন্যবাদ।
অনলাইন ক্লাসের অনেক সীমাবদ্ধতা থাকলেও এর অনেক সুবিধাও আছে। যেমন—ক্লাসটা রেকর্ড করে শিক্ষার্থীদের শেয়ার করা যায় যা তারা পরে বারবার প্লে করে শুনতে ও দেখতে পায়। ক্লাসগুলো আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে স্লাইড বানিয়ে উপস্থাপন করা হয়। প্রতিটি স্লাইডে গড় সময় একটু বেশি দিলে লেকচারটি বেশ ফলপ্রসূ হয় বলে আমার বিশ্বাস। অনেক সময় ব্লাক বোর্ডের দরকার হতে পারে, তবে সেটার জন্য অতিরিক্ত স্লাইড রাখা যেতে পারে। যা-ই হোক অনলাইন লেকচারে শিক্ষক অনেক আন্তরিক থাকেন এই জন্য যে ক্লাসটি রেকর্ডেড এবং ওপেন থ্রো করা হয়েছে। ক্লাসগুলোতে এফিলিয়েটেড কলেজের শিক্ষার্থীরাও পূর্বানুমতি সাপেক্ষে অংশগ্রহণ করার সুযোগ আছে। যদিও কিছু কিছু শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির বিষয়টির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এখনো সেভাবে করা হয়নি। অনেকেই বলছেন অনেক অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের টেকনিক্যাল সাপোর্ট ও ইন্টারনেট ক্রয়ে অক্ষমতাই এর মূল কারণ। তবে এই সংখ্যা কখনোই ১০-১৫ শতাংশের ওপরে নয় বলে আমার বিশ্বাস। প্রথমেই শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে অনুপস্থিতির সম্ভাব্য কারণগুলো নিরূপণ হওয়া উচিত, যেমন— ১. অসচ্ছলতার কারণে ফ্রি ইন্টারনেট প্যাকেজ ক্রয়ে অক্ষমতা। ২. ল্যাপটপ/ ডেক্সটপ কম্পিউটার নেই। ৩. হতে পারে কোনো প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকা, যেখানে ২জি সাপোর্ট আছে কিন্তু ৩জি নেই। ৪. সার্বক্ষণিক পাওয়ার থাকে না অথবা পাওয়ার নেই। ৫. ব্যাবহারিক ক্লাসের কী হবে এ নিয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়েরই মাথাব্যথা! ৬. পরীক্ষা কীভাবে হবে এ নিয়েও আছে মাথাব্যথা। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে ক্লাসে অনুপস্থিত থাকা বা ক্লাস করতে অবহেলা।
সম্ভাব্য সমাধান কী হতে পারে? আমার মনে হয় বিষয়গুলো একটু জটিল হলেও কিন্তু অসম্ভব নয়। দরকার সহজ সরল সঠিক প্ল্যান, শিক্ষার্থীদের প্রতি সুদৃষ্টি এবং কোভিড-১৯ বিষয়ক গাইডলাইনের নিশ্চিত প্রয়োগ। এর সম্ভাব্য সমাধান হচ্ছে- ১. অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি ইন্টারনেট (limited access) প্যাকেজের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অবশ্যই প্রতিটি বিভাগ অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের একটি তালিকা প্রস্তুত করবে। এ বিষয়ে প্রতিটি বিভাগ একটি কমিটি করে অনলাইন প্রশ্নাবলির মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অসচ্ছলতার বিষয়টি সঠিকভাবে বের করতে পারে এবং এটা খুব একটা জটিল কাজ নয় বলে আমি মনে করি। ২. যেসব অসচ্ছল শিক্ষার্থীর ল্যাপটপ/কম্পিউটার নেই তাদেরকে এটার ব্যবস্থা করে দেওয়া যেতে পারে এবং ভবিষ্যতে চাকরি পাওয়ার পর দুই বছরের মধ্যে এই টাকা বিনা সুদে সর্বোচ্চ ১০-১৫ কিস্তিতে পরিশোধ করার অঙ্গীকার করতে হবে। ৩. যাদের এলাকায় পাওয়ার নাই সেসব শিক্ষার্থীদের সোলার প্যানেল দিয়ে সাহায্য করা যেতে পারে। এ বিষয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান স্রেডাকে সংযুক্ত করা যেতে পারে। ৪. ব্যবহারিক ক্লাসগুলো আপাতত যতদিন পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটে ততদিন পর্যন্ত বন্ধ রাখাটাই সমীচীন হবে। প্রয়োজনে পরবর্তী সেমিস্টারের তাত্ত্বিক কোর্সগুলো আগেভাগেই নেওয়া যেতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে ব্যাবহারিক ক্লাস করতে ছাত্রছাত্রীদের জন্য বেশি সহায়ক হতে পারে। ব্যবহারিক ক্লাসগুলো পরে একসঙ্গে নেওয়া যেতে পারে। ৫. পরিস্থিতি উন্নতি হলে পরবর্তী সময়ে একসঙ্গে সব পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে, যেমনটি ২০-৩০ বছর আগে একসঙ্গে ৩য় বর্ষে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা হতো। তবে ইচ্ছা থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের নিজস্ব লোকেশনে সরকারি কলেজে/ মানসম্পন্ন লোকাল কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরীক্ষার খাতাপত্র পাঠিয়ে কলেজের দুই-চার জন শিক্ষককে পরিদর্শকের দায়িত্ব দিয়ে তাত্ত্বিক পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। ৬. তবে যেসব শিক্ষার্থী অনার্স/ মাস্টার্স শেষ বর্ষ বা শেষ সেমিস্টারে অবস্থান করছে, তাদের মতামত নিয়ে পরীক্ষা ও ব্যবহারিক ক্লাস সমাপ্তির জন্য ক্যাম্পাস প্রাথমিকভাবে খোলা যেতে পারে। অবশ্য কোভিড-১৯-এর স্বাস্থ্যবিধির প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে শিক্ষকদেরও কিছু প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া যেতে পারে।
পরিশেষে বলব, সব পর্যায়ে এমনকি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও ‘অনলাইনে কাজ করি করোনাকে জয় করি’—এই নীতির বাস্তবায়ন করতে হবে।
n লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী