তারকা

রূপালি পর্দার নায়করাজ

নায়করাজ রাজ্জাক। বাংলা চলচ্চিত্রের এক কিংবদন্তি। রাতারাতি নায়করাজ হননি, এজন্য তাঁকে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হয়েছে। ১৯৬০-এর দশক থেকে শুরু করে টানা প্রায় তিন দশক বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে দোর্দণ্ড দাপটের সঙ্গে শীর্ষ তারকা অভিনেতা হিসেবে বিরাজ করেছেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নায়ক হিসেবে রাজ্জাক যখন রাজত্ব করছেন, সে সময় পশ্চিমবঙ্গের বাংলা চলচ্চিত্রেরও বেশ দাপট ছিল এদেশে। উত্তম কুমার-সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নায়ক হিসেবে তিনি নিজের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। প্রায় ৬৫ বছরে ৩০০-র বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।

কৈশোরে তাঁর ইচ্ছে ছিল ফুটবলার হওয়ার। গোলকিপার হিসেবে খেলতেন ভালো। বেশ নামডাকও হয়েছিল। বিভিন্ন পাড়ায় হায়ার করে নিয়েও যাওয়া হতো। কলকাতায় যে পাড়ায় থাকতেন, সে পাড়াতেই থাকতেন শক্তিমান অভিনেতা ছবি বিশ্বাস, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিনয়শিল্পীরা। ছবি বিশ্বাসের কাছে রাজ্জাক আবৃত্তি শিখেছেন পাড়ার অন্য ছেলেমেয়েদের সঙ্গে।

কলকাতা থেকে শূন্য হাতে স্ত্রী এবং শিশুপুত্রকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা এসেছিলেন। সেই অবস্থা থেকে জীবনযুদ্ধ শুরু করে এক সময় জয়ী হয়েছেন। নিজের সেই জীবনের কথা তিনি কোনোদিন অস্বীকার করেননি। রাজ্জাক অনেকবার তাঁর অতীত জীবনের কথা বলতে গিয়ে অকপটে বলেছেন, ‘আমি আমার জীবনের অতীত ভুলি না। আমি এই শহরে রিফিউজি হয়ে এসেছি। স্ট্রাগল করেছি। না-খেয়ে থেকেছি। যার জন্য পয়সার প্রতি আমার লোভ কোনোদিন আসেনি। ওটা আসেনি বলেই আজকে আমি এতদূর শান্তিতে এসেছি।’ তিনি আরো বলতেন, ‘আমার প্রেম, আমার ভালোবাসা আমার সবকিছুই অভিনয়, চলচ্চিত্র। এছাড়া আমি আর কিছু জানি না, পারি না। আল্লাহ অনেক সুযোগ দিয়েছেন, অনেক কিছু করতে পারতাম। করিনি।’

শুরুতে ছোট পর্দায় কাজ করলেও চলচ্চিত্রে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে ক্যারিয়ার শুরু তাঁর। জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ ছবিতে লখিন্দর চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বাজিমাত করেন রাজ্জাক। এরপর সাফল্যের সিঁড়ি অতিক্রম করে এদেশের কোটি কোটি চলচ্চিত্র-দর্শকের হূদয়ে ঠাঁই করে নেন। পরিণত হন ‘স্ক্রিন আইডল’-এ। এর মধ্য দিয়ে তিনি অর্জন করেন ‘নায়করাজ’ খেতাব। সিনে পত্রিকা ‘চিত্রালী’ সম্পাদক আহমেদ জামান চৌধুরী তাঁকে নায়করাজ খেতাবটি দিয়েছিলেন। যখন এদেশের চলচ্চিত্র কলকাতা, বোম্বে, লাহোরের ছবির দাপটে দাঁড়াতে পারছিল না, এখানকার চিত্রনির্মাতারা খুবই শঙ্কিত ছিলেন নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে—সেই সময় থেকে বাংলাদেশের সিনেমাকে জনপ্রিয় এবং শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক। সুদর্শন রাজ্জাক একদিকে যেমন ছিলেন রোমান্টিক নায়ক হিসেবে সর্বমহলে জনপ্রিয়, তেমনি ভিন্ন ধাঁচের চ্যালেঞ্জিং নানা চরিত্রে তাঁর দক্ষতা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন বারবার। এভাবে তিনি ক্রমেই নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়।