“তত্কালীন রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতেই ১৬ বছর আগে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে প্রকাশ্য দিবালোকে চালানো হয়েছিল ভয়াবহ আর্জেস গ্রেনেড হামলা। নৃশংস ঐ হামলার মূল লক্ষ্য ছিল তত্কালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ‘শেখ হাসিনাকে হালকা নাশতা করানো হবে’—এই উদ্ধৃতি দিয়েই দেশীয় জঙ্গি সংগঠন হুজির কতিপয় সদস্য আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় আওয়ামী লীগের ডাকা ঐ সমাবেশে হামলা চালায়। ঐ গ্রেনেড ছিল স্পেশালাইজড মারণাস্ত্র, যা সাধারণত সম্মুখ সমরে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।”—বিচারিক আদালতের দেওয়া রায়ের পর্যবেক্ষণে এভাবেই উঠে এসেছে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার উদ্দেশ্য।
ঐ হামলার ঘটনায় করা হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের দুটি মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া রায়ের প্রায় দুই বছরের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রস্তুত করেছে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ১ হাজার ৮০ ভলিউমের ৯০টি পেপারবুক। সরকারি ছাপাখানা বিজি প্রেসের সহায়তায় ঐ পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়েছে। এখন পেপারবুক পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ করছে হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখা। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কোনো ত্রুটি ধরা পড়লে তা সংশোধন করা হবে। এর পরই পলাতক আসামিদের পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিযুক্ত করে শুনানির জন্য নথি প্রধান বিচারপতির কাছে উপস্থাপন করবে ডেথ রেফারেন্স শাখা। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন তখন মামলাটি শুনানির জন্য হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স বেঞ্চে পাঠিয়ে দেবেন। নতুবা মামলাটি শুনানির জন্য নতুন কোনো বেঞ্চ গঠন করে দেবেন। সূত্র জানিয়েছে, সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে চলতি বছরের অক্টোবর মাসের মধ্যে মামলাটি শুনানির জন্য বেঞ্চে উপস্থাপন হতে পারে।
এদিকে পেপারবুক প্রস্তুত হওয়ায় চাঞ্চল্যকর এই দুটি মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের ওপর দ্রুত শুনানির জন্য আবেদন করতে রাষ্ট্রপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গতকাল ইত্তেফাককে বলেছেন, আপিলের পেপারবুক যখন প্রস্তুত হয়ে গেছে তখন আমি অ্যাটর্নি জেনারেলকে নির্দেশ দিয়েছি যেন উনি মামলাটি তাড়াতাড়ি শুনানি করার জন্য একটি আবেদন করেন। শুনানির একটি তারিখ নির্ধারণের জন্য আদালতের কাছে প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, মামলায় তারেক রহমানসহ দণ্ডিত পলাতক অন্য আসামিদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জানিয়েছেন, শুনানির জন্য দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিচারিক আদালত আসামিদের যে দণ্ড দিয়েছে তা যেন বহাল থাকে সেজন্য শুনানিতে সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে।
প্রসঙ্গত, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার দুটি মামলায় ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, শিক্ষামন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, সাবেক ঊর্ধ্বতন দুই সেনা কর্মকর্তা রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী ও আব্দুর রহিমসহ ১৯ আসামিকে ‘ডাবল মৃত্যুদণ্ড’ দেয় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১। দণ্ডিতদের মধ্যে অধিকাংশই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতা। অভিন্ন অভিপ্রায়ে পরিকল্পনা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ ২৪ জনকে হত্যা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অসংখ্য নেতাকর্মীকে গুরুতর জখম করার দায়ে আসামিদের এ দণ্ড দেওয়া হয়। একই অপরাধে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে ‘ডাবল’ যাবজ্জীবন সাজা দেয় ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া পুলিশের সাবেক তিন আইজিসহ আট কর্মকর্তা ও তিন সেনা কর্মকর্তা পান লঘু দণ্ড।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়, তারেক রহমানের আশ্বাসেই ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল। এ ব্যাপারে তত্কালীন প্রশাসনের প্রশাসনিক সহায়তাও পেয়েছিল জঙ্গিরা। হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান ও তার সহযোগীরা গ্রেনেড হামলার কিছু দিন আগে বনানীর হাওয়া ভবনে গিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। তখন সেখানে উপস্থিত লুত্ফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সেনা গোয়েন্দা সংস্থার তত্কালীন পরিচালক সিআইবি মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, এনএসআইয়ের তত্কালীন ডিজি ব্রিগেডিয়ার (অব.) আব্দুর রহিমের সঙ্গে ষড়যন্ত্রমূলক বৈঠক করেন। বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও তার দলের নেতাদের হত্যা করার সহযোগিতা চায় জঙ্গিরা। তারেক রহমান উপস্থিত সবার সামনে জঙ্গিদের সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
পেপারবুক ও আপিলের তথ্য
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের দুটি মামলায় ৯০টি পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিটি পেপারবুকের পৃষ্ঠা সংখ্যা ১০ হাজার। একেকটি পেপারবুকের ভলিউম সংখ্যা ১৩টি করে। সেই হিসাবে ৯০টি পেপারবুকের ভলিউম সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮০টি। এই দুটি মামলায় ৩৯টি নিয়মিত আপিল এবং ২৪টি জেল আপিল বিচারাধীন রয়েছে। তবে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তদের সাজা বৃদ্ধি চেয়ে কোনো ধরনের আপিল এখনো করেনি রাষ্ট্রপক্ষ। তবে অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন, তারেক রহমানসহ যাদের যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয়েছে মামলার নথি পর্যালোচনা করে যদি দেখা যায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতো উপাদান রয়েছে তাহলে আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।