অণুগল্প

প্রথম জেল

 

দারোগা এসে দাঁড়াল টাউন হল মাঠে। আড়চোখে দেখে নিল মাঠের ওপাশে শেখ লুত্ফর রহমানের বাসাটা। সরাসরি ওখানে যেতে সংকোচ হচ্ছে। খবরটা ঠিকই পৌঁছে গেল শেখ মুজিবের কাছে। তিনি তখন বাসাতেই।

শেখ লুত্ফর প্রত্যেক শনিবার গোপালগঞ্জ শহর থেকে চৌদ্দ মাইল দূর গ্রামের বাড়ি যান। আবার সোমবার সকালে ফিরে আসেন। নিজেদের নৌকায়।

তিনি আজ সকালে ফিরবেন।

এর মধ্যেই মামলা দায়ের হয়ে গিয়েছে। শহরের প্রভাবশালী কয়েকজন হিন্দু নেতা রাতে একসঙ্গে বসেছিলেন। সেখানে তাঁদের সম্প্রদায়ের অফিসাররাও উপস্থিত ছিলেন। সবাই মিলেমিশে শলাপরামর্শ করে একটা মামলা সাজালেন। নেতারা থানায় বসে এজাহার ঠিক করে দিলেন। থানার দারোগা বাবু একই গোত্রের, তারও উত্সাহের কমতি নেই।

ফুফাতো ভাই ছুটতে ছুটতে এসে শেখ মুজিবকে বললেন : মিয়াভাই, পাশের বাসায় একটু সরে যাও না।

শেখ মুজিব জ্বলন্ত চোখে ভায়ের দিকে তাকালেন। দৃঢ় কণ্ঠে বললেন : যাব না। আমি পালাব না। লোকজন বলে বেড়াবে, আমি ভয় পেয়ে পালিয়েছি।

শেখ মুজিব ঘরেই রইলেন। অবাক হয়ে ভাবতে লাগলেন রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচ। একটা সামান্য ঘটনা কিভাবে তিল থেকে তাল হয়।

খন্দকার শামসুদ্দীনের আত্মীয় আবদুল মালেক শেখ মুজিবেরও সহপাঠী। সেদিন সন্ধ্যেবেলা শেখ মুজিব ফুটবল খেলে মাঠ থেকে বাড়িতে ফিরেছেন। এসময় খন্দকার শামসুল হক মোক্তার দেখা করতে খবর পাঠালেন।

শেখ মুজিব এলে তিনি বললেন : আমাদের মালেককে ধরে নিয়ে গিয়েছে। হিন্দু মহাসভার সভাপতি সুরেন ব্যানার্জীর বাড়িতে আটক আছে। তাকে খুব মারপিট করেছে। যদি পার, একবার যাও। তোমার সঙ্গে তো ওদের বন্ধুত্ব। দেখো, ছাড়িয়ে আনতে পারো কি না।

শেখ মুজিব সঙ্গে কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে সেখানে গেলেন। অনুরোধ করলেন মালেককে ছেড়ে দিতে।

রমাপদ দত্ত নামে এক লোক সেখানে ছিল দলবলসহ। শেখ মুজিবকে দেখেই সে তেতে উঠল। মুখ খিস্তি করে গাল দিল। প্রতিবাদ করলেন শেখ মুজিব। কথা কাটাকাটিতে পরিবেশ আরো গরম হয়ে উঠল। হাতাহাতি পর্যায়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।

শেখ মুজিব তাঁর দলের লোকজনদের খবর দেয়ার ব্যবস্থা করলেন।

এর মধ্যে রমাপদও থানায় খবর দিয়েছে। তিনজন পুলিশও এসে হাজির।

শেখ মুজিব জলদগম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণ দিলেন : মালেককে ছেড়ে দিতে হবে। নইলে কেড়ে নেব।

উত্তেজনা বাড়তে থাকল। মারামারিও শুরু হয়ে গেল। এর মধ্যেই মালেক যে ঘরে আটক, সে ঘরের দরজা ভেঙে তাকে উদ্ধার করা হলো।

এই ঘটনাকেই খুনোখুনির রং লাগিয়ে জোরদার মামলা। শহরের গণ্যমান্য ঘরের অনেকেই গ্রেফতার। এবার শেখ মুজিবের পালা।

শেখ লুত্ফর গ্রামের বাড়ি থেকে ফিরছেন। তাঁর পেছনে পেছনে দারোগাও বাসায় এলো। এর ফাঁকেই সে এখানে তার আসার উদ্দেশ্য জানাল। শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও দেখাল। সব শুনে শেখ লুত্ফরের মুখমণ্ডল খানিকটা ভারী হয়ে এলো। বললেন : ঠিক আছে, নিয়ে যান।

দারোগা অপ্রস্তুত হয়ে বলল : এখনি যেতে হবে না। ছেলেটা এখন খাওয়াদাওয়া করে নিক। আমি একজন সিপাই রেখে যাচ্ছি। এগারোটার মধ্যে থানায় পৌঁছালে চলবে। তবে দেরি করে না যেন। তাহলে জামিন পেতে অসুবিধা হবে।

পিতা এবার পুত্রকে ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন : মারামারি করেছ?

পুত্র কোনো জবাব দিলেন না। মাথা নিচু করে রইলেন।

এর মানে, তিনি যে মারামারি করেছেন, তা সত্য। খাওয়াদাওয়া সেরে শেখ মুজিব থানায় এলেন। সেখানে পরিচিত অনেককেই গ্রেফতার অবস্থায় দেখতে পেলেন। তিনি থানায় পৌঁছতেই সবাইকে কোর্টে পাঠিয়ে দেয়া হলো।

শেখ মুজিবকে দেখিয়ে কোর্ট দারোগা বলল : মজিবর খুব ভয়ানক ছেলে। ছোরা মেরেছিল রমাপদকে। কিছুতেই জামিন দেয়া যায় না।

শেখ মুজিব তাকালেন সেদিকে। বললেন : বাজে কথা বলবেন না, ভালো হবে না।

কোর্ট দারোগা বলল : দেখো, ছেলের সাহস!

মারামারি হলো লাঠিতে। তাও সেটা শুরু করল রমাপদ নিজেই। সেই লাঠি বনে গেল ছোরায়। লাঠির আঘাতে মাথার এতটুকু জখম হয়ে গেল। ছোরা দিয়ে হত্যা প্রচেষ্টায় মারাত্মক আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। এজাহারে ঘটনা এভাবেই সাজানো হয়েছে। মামলার বিচারক এসডিও বাবু নিজ সম্প্রদায়ের পক্ষেই টান দেখালেন। জামিনের আবেদন না-মঞ্জুর করে একজন বাদে আর সবাইকে পাঠিয়ে দিলেন জেলহাজতে।

বঙ্গবন্ধুর প্রথম জেল।