ড. আর এম দেবনাথ
বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস-১৯-এর বয়স পাঁচ মাসেরও বেশি—মার্চ থেকে আগস্ট। এরই মধ্যে গেল অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিবস। স্বাধীনতা দিবস গেল মার্চে। এপ্রিলে গেল বাংলা নববর্ষ। মে মাসে গেল শ্রমিকদের মে দিবস। গেল দুটো পবিত্র ঈদ। জুন মাসে সংক্ষিপ্ত বাজেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হলো এবং জুলাই মাস থেকে তা কার্যকর। এরই মধ্যে আমাদের ভয়াবহ বন্যার শিকার হতে হলো। একে তো ‘করোনার’ ভয়াবহ আক্রমণ, তদুপরি নজিরবিহীন বন্যা। এসব দিবস, ঘটনা আমাদের জন্য ছিল আনন্দ-বেদনার। এখন আগস্ট মাসের শেষ। এই মাস শোকের মাস। এতসবের মধ্যে অবশ্য পালিত হচ্ছে মুজিববর্ষ। এই হচ্ছে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চিত্র। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বোঝা যাচ্ছিল আমরা বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আমরা পুনরুদ্ধার/পুনর্গঠন নিয়ে ভাবিত। সরকার লক্ষাধিক টাকার প্রণোদনা কার্যকর করেছে, যা অবশ্য ব্যাংক ঋণনির্ভর। শিল্প ঋণ, ছোট ও মাঝারি ঋণ, ওয়ার্কিং ক্যাপিট্যাল এবং রপ্তানির জন্য ঋণ ও অন্যান্য সুবিধা প্রণোদনা প্যাকেজের আওতাভুক্ত। এসবই একটা উদ্দেশ্যে করা। অর্থনীতিকে সচল করাই উদ্দেশ্য। সবকিছু স্থবির, কলকারখানা বন্ধ। অফিস-আদালত অনিয়মিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। কোথাও কোথাও চলছে ‘অনলাইন শিক্ষা’। এতসব হতাশা-আশার মধ্যেই আমরা অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে ভালো একটা সংবাদ পেলাম। আমাদের আশঙ্কা ছিল ‘অর্থনীতি-জিডিপি’ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হবে, নেতিবাচক পর্যায়ে না গেলেও আশঙ্কাজনক হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমবে। অন্যান্য দেশে এটাই ঘটছে। না, খবর এত হতাশাজনক নয়। ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হার ২০১৯-২০ অর্থবছরে সাড়ে ৫ শতাংশ হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এমন বৈরী পরিবেশে এই প্রবৃদ্ধির হার সন্তোষজনক। সাড়ে ৮ শতাংশের জায়গায় সাড়ে ৫ শতাংশ। কম কী? রপ্তানির পরিমাণ ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ৩ হাজার ৯৮০ কোটি ডলার। এর আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ অবশ্য। কিন্তু যেখানে আশঙ্কা ছিল, রপ্তানি তছনছ হয়ে গেছে, সেখানে এই অগ্রগতিকে হেলাফেলা করি কীভাবে? সবচেয়ে আনন্দের এবং অনুকূল খবর অবশ্য রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে। ‘মিডিয়া’ রিপোর্ট পড়ে পড়ে মনে হচ্ছিল ‘রেমিট্যান্স’ বড় ধসের শিকার হবে। না, তা হয়নি। বরং উলটো ঘটেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ১৮ বিলিয়ন ডলার। যেখানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল সাড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলারের মতো। অর্থনীতির দুই স্তম্ভ রপ্তানি ও রেমিট্যান্স দেখা যাচ্ছে মোটামুটি সন্তোষজনক, অন্তত আশঙ্কাজনক নয়। এদিকে রাজস্ব, মানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন রাজস্ব আদায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে ততটা হতাশাজনক ছিল না। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন ২০১৯-২০ অর্থবছরে রাজস্ব আহরিত হয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় ৫ হাজার কোটি টাকা কম। এদিকে অর্থনীতির মূল স্তম্ভ কৃষি বরাবরের মতোই এই দুর্দিনেও ‘বাম্পার’ ফলন দিয়েছে, যদিও আশঙ্কা ছিল ‘বোরো’ ফলন ঘরে আনা যাবে না শ্রমিকের অভাবে। না, তা হয়নি। অবশ্য আমনে কিছুটা সমস্যার সম্মুখীন হয়তো হতে হবে। এর কারণ বন্যা। যদি এ মাসে অথবা সেপ্টেম্বরে আরেকটা বন্যার সম্মুখীন আমরা না হই, তাহলে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে। এই হচ্ছে মোটামুটি অর্থনীতির একটা চিত্র। কিন্তু এই চিত্রই কী শেষ কথা বলে? মনে হয় না। অন্তত খবরের কাগজের প্রতিবেদন পড়ে বোঝা যাচ্ছে, আমরা বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বিষয়টি বোঝার জন্য আমি দৈনিক ইত্তেফাকের পাঁচ কিস্তির একটি রিপোর্টের আশ্রয় নেব। সিরিয়াল এই রিপোর্টটি করেছেন জামাল উদ্দীন। প্রকাশিত হয়েছে ৯ আগস্ট থেকে ১৩ আগস্টের মধ্যে। খবরের ভেতরে অনেক তথ্য আছে, বিশ্লেষণ আছে, আছে বিশেষজ্ঞদের মতামত। সেগুলোতে যাওয়ার আগে শুধু শিরোনামগুলো কী ছিল তা দেখা যাক। প্রথম রিপোর্টটির শিরোনাম ‘স্থবির ব্যবসায়-বাণিজ্যে গতি ফিরছে না শিগিগর, পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াও শ্লথ, কর্মসংস্থান বড় চ্যালেঞ্জ’। দ্বিতীয় খবরটির শিরোনাম :‘সাধারণের দুর্বিষহ জীবন, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে দুর্দিন ক্ষুদ্র ও মাঝারি অনেক উদ্যোক্তার ব্যবসায়ে ফেরা অনিশ্চিত।’ তৃতীয় কিস্তির শিরোনাম :‘প্রভাবশালীদের জন্যই যত সুবিধা ঋণ পাচ্ছেন না সব উদ্যোক্তা ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ যথেষ্ট নয়।’ চতুর্থ সংবাদটার শিরোনাম :‘প্রণোদনা স্বস্তির বদলে আস্থা ও প্রত্যাশার সংকট আসছে ঘুষ প্রসঙ্গ, নীতিমালায় সংস্কার চান ব্যবসায়ীরা।’ সর্বশেষ কিস্তির শিরোনাম :‘নগদ অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধি ও দুই বছর মেয়াদি পুনরুদ্ধার কৌশল জরুরি চাকরিচ্যুত বা ব্যবসায়চ্যুতদের সহায়তা দিতে হবে। নীতিসহায়তা, ব্যক্তি পর্যায়ের ঋণেও পুনর্গঠনের সুবিধা দরকার। খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।’ বেশ কিছুটা দীর্ঘ হলেও আমি ইচ্ছে করেই পাঁচ কিস্তির রিপোর্টের সবগুলোর শিরোনামই উদ্ধৃত করেছি। এর কারণ কী? কারণ শুধু শিরোনাম পড়লেই বোঝা যাবে অর্থনীতির দুটো চিত্র আছে। একটি যা আমরা সাদা চোখে দেখতে পাচ্ছি। আরেকটি বিষয় যা অনুকূল খবরের ভারে চাপা পড়ে যাচ্ছে। সেই চাপা পড়া দিকটা কী? মোট কথা কর্মসংস্থান চাই। ‘ক্যাশ’ চাই। মানুষের হাতে ক্যাশ চাই। রিপোর্টগুলো স্ক্যান করলে দেখা যাবে, এসবে সমস্যার কথা যেমন বলা হয়েছে তেমনি বলা হয়েছে সমাধানের কথা। বলা হচ্ছে, ব্যবসায়-বাণিজ্য স্থবির। প্রণোদনা দেওয়া সত্ত্বেও তাতে গতি ফিরে আসছে না। প্রণোদনা বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলো আলোচনা করছে। ঘুষ-দুর্নীতিও হচ্ছে। বড়রা, প্রভাবশালীরা সব সুবিধা নিয়ে নিচ্ছে। ছোট ও মাঝারিরা ব্যাংকের ধারেকাছেও যেতে পারছে না। নন-ফরম্যাল, অর্থাত্ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। অর্থাত্ সংগঠিত নয়, কোম্পানি আকারে নয় যেসব কর্মকাণ্ড তা ক্ষতিগ্রস্ত বেশি। এর মধ্যে পড়ে গরিব মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ—রিকশাওয়ালা, ছোট ছোট দোকানদার, নির্মাণকর্মী, সেলুনকর্মী, দৈনিক মজুর শ্রেণির লোক, স্বনিয়োজিত লোকজন ইত্যাদি শ্রেণির লোক। এরাই সংখ্যায় লাখ লাখ নয়, কোটি কোটি। এরা কর্মহীন, চাকরিহীন, ব্যবসাচ্যুত। এদের মধ্যে প্রাণসঞ্চার না হলে অর্থনীতি গতি ফিরে পাবে না। অর্থাত্ এদের হাতে নগদ টাকা না এলে অর্থনীতি গতি পাবে না। এটা তখনই আসতে পারে যখন কর্মসংস্থান হবে। কর্মসংস্থানের কী অবস্থা তা ফকিরাপুলের কাছে গেলেই বোঝা যায়। শত শত কর্মহীন নির্মাণকর্মী-ওস্তাগার ও সাহায্যকারী, কাঠমিস্ত্রি সারা দিন বসে আছে, তাদের কোনো কর্ম নেই। কর্ম না থাকলে ‘ক্যাশ’ও নেই। ‘ক্যাশ’ না থাকলে তারা বাজারে যাবে কীভাবে? বাজার চাঙ্গা হতে পারে চাহিদা থাকলে অর্থাত্ পণ্যের ‘ডিমান্ড’ থাকলে। পণ্যের ডিমান্ড সৃষ্টির জন্য দরকার ক্রয়ক্ষমতা। এটা নেই সিংহভাগ মানুষের। এমনিতে দেশে ২৫ শতাংশ মানুষ ছিল দরিদ্র শ্রেণির। করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ এবং বন্যায় এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে বলে অনেকের হিসাব। বিপুলসংখ্যক লোকের ঘরে খাবার নেই। গরু-ছাগল কেনার লোক নেই। বন্যায় বাসস্থান গেছে। অনেকের ফসল গেছে, গবাদি পশু গেছে। গেছে চাষের মাছ এবং হাঁস-মুরগি। ফলে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে অগণিত মানুষ। মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তের কষ্টের কথা কে বলে? তাদের দুঃখকষ্টের সীমা নেই। তারা সরকারের কাছে সাহায্য চাইতে পারে না। লাইন ধরে চালও কিনতে পারে না। শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের খাবার দুধ নেই। এসব অভাব-অনটনের একমাত্র ওষুধ কর্মসংস্থান। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে কলকারখানা পুরোদমে চললে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কলকারখানা। ছোট ছোট ব্যক্তিগত উদ্যোগেই বেশির ভাগ মানুষ নিয়োজিত। অথচ এসব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তাদের সঞ্চয় নেই বড়দের মতো। এ ধরনের অবস্থায় সরকারের প্রণোদনা কাজে লাগতে পারত। কিন্তু সব প্রণোদনাই ব্যাংকনির্ভর। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সীমা নেই। আবার তাদেরও অনেক কথা আছে, যা কেউ শুনতে রাজি নয়। সম্পদ সীমিত। তার ওপর ভাগিদার বড় বড় ব্যবসায়ীরা। বড় বড় ব্যবসায়ীরাই ব্যাংকের মালিক। কর্মচারীরা কার স্বার্থ দেখবে? চাকরি রাখবে, না দেশের স্বার্থ দেখবে? এ এক ভীষণ বিড়ম্বনা। ঘুষ-দুর্নীতির পাশাপাশি এ বিষয়টিও ক্রিয়াশীল বাংকগুলোতে। খেলাপি ঋণ আতঙ্কের বিষয়। এর পরিমাণ কমার কোনো লক্ষণ নেই। খেলাপির সংজ্ঞা পরিবর্তন করে সাময়িক সুবিধা হচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে সব সমস্যা পড়বে ব্যাংকের ঘাড়ে—এটাই তাদের বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। এই বিষয়টিও ভেবে দেখতে হবে। এই প্রসঙ্গে আমি একটি কথা বলতে চাই। রিপোর্টে বলা হয়েছে দুই বছরের ‘পুনরুদ্ধার’ কর্মসূচির কথা। আমি ‘পুনরুদ্ধার’ না বলে ‘পুনর্গঠন’ (রিকনস্ট্রাকশন) ‘পুনরুদ্ধার’বলতে চাই। মানুষ বড় বড় বিপদের পর তার থেকে শিক্ষা নেয়, জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলে। আমাদেরও আজ সারা বিশ্বের মতো মহাবিপদ। আমি মনে করি, আমরা করোনা-পূর্ববর্তী পর্যায়ে যাওয়ার কথা যখন বলি তখন আমাদের আবর্জনার কথা মনে থাকে না। উন্নয়নের পাশাপাশি অর্থনীতিতে প্রচুর আবর্জনা—চুরি, দুর্নীতি, অপচয়, ঋণখেলাপ ইত্যাদি জমা হয়েছে। ভবিষ্যতে আবর্জনামুক্ত অর্থনীতি গড়ে তোলা দরকার। বাজার অর্থনীতিকে আরো মানবিক করে তোলা দরকার।
n লেখক : অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক