প্রত্নতত্ত্ব-শিক্ষার্থীর চাকরির ক্ষেত্র

ওয়ালীউল্লাহ মিঠু

 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯২ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ যাত্রা শুরু করে ইতিহাসের মেধাবী শিক্ষার্থীদের হাত ধরে। বর্তমানে সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে তাঁরা বিভাগে কর্মরত। ২০১৩ সালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েও খোলা হয় বিভাগটি। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও ‘ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব’ নামে বিভাগ রয়েছে। যেখানে প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষার্থীরা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।

একাডেমিক সিলেবাসে ইতিহাসের ওপরেই সিংহভাগ নম্বরের কোর্স পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। ইতিহাস হচ্ছে তত্ত্বগত বিষয়ের মাধ্যমে অতীত ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির জ্ঞান। আর প্রত্নতত্ত্ব হলো বস্তুগত (প্রত্নবস্তু) নিদর্শনের মাধ্যমে অতীত সংস্কৃতির জ্ঞান। ইতিহাসের তত্ত্বগত জ্ঞান নিয়েই প্রত্নতত্ত্বের গবেষণা শুরু হয়। অর্থাত্ একজন প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষার্থীর ইতিহাসের জ্ঞান অর্জন করা প্রাথমিক দায়িত্ব। পরে প্রত্নতাত্ত্বিক গষেণায় অনেক সময় তত্ত্বগত ইতিহাস সংযোজন বা বিয়োজনও হয়। বলা চলে ইতিহাসের সত্যায়ন বা ইতিহাস সমৃদ্ধির কাজই করে প্রত্নতত্ত্ব। প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় প্রাচীন, মধ্যযুগ ও আধুনিক বাংলার ইতিহাস, জাদুঘর ও উচ্চতর জাদুঘরবিদ্যা, বিশ্ব-সভ্যতা, স্থাপত্যবিদ্যা, নৃবিদ্যা, সামাজিক গবেষণা পদ্ধতি, তত্ত্বচিন্তা, শিল্পকলা এবং চিত্রশাস্ত্র, এপিগ্রাফি, হেরিটেজ ম্যানেজমেন্টসহ প্রত্নতত্ত্ব সম্পর্কিত অন্য আরো বিষয়। এজন্য সমাজবিজ্ঞানের সনদও পেয়ে থাকে শিক্ষার্থীরা।

প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষকরা জাতীয় শিক্ষাক্রমের পাঠ্যপুস্তকের ইতিহাস, সামাজিক বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় প্রভৃতি বিষয়ের রচনা কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের লিখিত ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক বই এবং প্রবন্ধ স্কুল কলেজ এবং বিশ্ববিদালয়ে পড়ানো হয়। সরকারি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগসহ অন্য বিভাগের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য বিষয়ের কোর্সের ক্লাস নিয়ে থাকেন। অনেক প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষার্থী সরকারি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ীভাবে ইতিহাস, বাংলাদেশ স্টাডিজ এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের শিক্ষক হিসেবেও নিয়োজিত আছেন। ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রত্নতত্ত্ব এবং জাদুঘর বিষয়ক জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনেও সম্পৃক্ত প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষরা। জাতীয় পর্যায়ের সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণেও ইতিহাস বিষয়ে ক্লাস নেন প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষকরা।

অথচ প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষার্থীরা বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে, শিক্ষা নন-ক্যাডারে, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধনে স্কুল-কলেজের চাকরিতে আবেদনই করতে পারে না। সমাজবিজ্ঞানের সনদ থাকা সত্ত্বেও সামাজিক বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট বিষয়ের চাকরিতে আবেদন করার সুযোগ নেই।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এবং জাদুঘরের চাকরিতে এককভাবে প্রাধান্য পাওয়ার কথা থাকলেও অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে আবেদন করতে হয়। অনেক চাকরিতে ইতিহাস এবং ইসলামের ইতিহাস চাওয়া হয়, কিন্তু প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারে না। অথচ অনেক চাকরিতে যেখানে প্রত্নতত্ত্ব চাওয়া হয়, সেখানে ইতিহাস ও ইসলামের ইতিহাস আবেদন করতে পারে। অর্থাত্ প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষার্থীদের নিজস্ব কোনো একক চাকরির ক্ষেত্র নেই। প্রত্নতত্ত্বের যৌক্তিক নিজস্ব ক্ষেত্রগুলোতে ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাসসহ অন্যান্য অনেক বিষয় আবেদন করতে পারে। খুব নগণ্য সংখ্যক দু’একটা ক্ষেত্রে প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে আবেদন করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগ অথচ তার শিক্ষার্থীদের চাকরির ক্ষেত্র থাকবে না কেন? এত শিক্ষার্থী প্রতি বছর ডিগ্রি নিয়ে বের হয়ে কোথায় যাবে?

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগ হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের এবং যৌক্তিক উপযোগিতা সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই।

ঢাকা