হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত রবিন সাড়ে পাঁচ মাস কারাবন্দি

থানার খণ্ডকালীন তথ্য নিবন্ধনকারীর বিরুদ্ধে

মাদক ব্যবসার অভিযোগ পুলিশের

জামিউল আহসান সিপু

রবিন আহমেদ রাশেদ। পল্লবীর ৩ নম্বর লেনের ১২ নম্বর রোডের ১০ নম্বর বাড়িতে মা রাজিয়া সুলতানাকে নিয়ে থাকেন। রবিন মিরপুরের বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ডিগ্রির তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি পল্লবী থানায় তথ্য নিবন্ধন ও ডাটা এন্ট্রির পার্টটাইম কাজ করেন। থানায় যাতায়াত করেন বলে সেখানকার প্রায় সবাই তাকে চেনেন। রবিনকে থানায় আটকে রেখে ২১৫ গ্রাম হেরোইন ও ১৫ পিস ইয়াবা দিয়ে গ্রেফতারের অভিযোগ উঠেছে। গত ৫ মার্চ পল্লবী থানার এসআই সুজন কুমার চক্রবর্তী রবিনকে গ্রেফতার করে তার বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলা দায়ের করেন। বর্তমানে রবি কেরানীগঞ্জ কারাগারে বন্দি। ঘটনাটি সাজানো দাবি করে রবিনের মা রাজিয়া সুলতানা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

রাজিয়ার অভিযোগ, পল্লবী থানার পরিদর্শক (অপারেশন্স) ইমরানুল ইসলামের নির্দেশে এসআই সুজন কুমার চক্রবর্তী তার ছেলেকে হেরোইন ও ইয়াবা দিয়ে গ্রেফতার দেখিয়েছেন। রবিন হেপাটাইটিস (বি+) রোগে আক্রান্ত। করোনায় লকডাউনের কারণে তিনি আদালতে রবিনের জামিনের আবেদন করতে পারেননি। এ কারণে গত সাড়ে পাঁচ মাস ধরে রবিন কারাবন্দি।

রাজিয়া জানান, তার গত ৪ মার্চ সন্ধ্যায় এসআই সুজন রবিনকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে ডিউটি অফিসারের রুমের সোফায় বসিয়ে রাখেন। এসআই সুজন ঐ দিন রাত সাড়ে ১২ টার দিকে তাকে (রাজিয়া সুলতানা) ফোন করে থানায় যেতে বলেন। তিনি থানায় গেলে এসআই সুজন তাকে বলেন, তার ছেলে ১২/বি ব্লকের এক বাড়ির মালিককে নাইজেরিয়ানদের ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়ার জন্য ৪০ হাজার টাকা অগ্রিম প্রদান করেছে। এ তথ্য জানার পর তিনি পুলিশকে জানান যে, ঐ টাকাটা তার কাছে রয়েছে। নাইজেরিয়ানদের কাছে বাড়ির মালিক তার ফ্ল্যাট ভাড়া দেবে না বলে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি অগ্রিম দেওয়া ৪০ হাজার টাকা রবিনের কাছে ফেরত দেন। পরবর্তী সময়ে নাইজেরিয়ানদের পাওয়া যাচ্ছে না বলে টাকা তিনি ফেরত দিতে পারছিলেন না।

রাজিয়ার এমন কথায় উপস্থিত পরিদর্শক (অপারেশন্স) ইমরানুল ইসলাম অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে ১০ মিনিটের মধ্যে টাকা এনে দেওয়ার নির্দেশ দেন । অন্যথায় রবিনকে ইয়াবা দিয়ে ধরিয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বাসা থেকে ৪০ হাজার টাকা এনে এসআই সুজনের হাতে তুলে দিয়ে তার ছেলেকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। এক পর্যায়ে এসআই সুজন তাকে (রাজিয়া) থানা থেকে বের করে দিলে তিনি বাইরে অপেক্ষা করেন। পরে পুলিশ রবিনকে ডিউটি অফিসারের কক্ষ থেকে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে বেধড়ক পেটায়।

রাজিয়া বলেন, তিনি তার অসুস্থ ছেলেকে রক্ষায় পুলিশ সদস্যদের পা ধরেও নিস্তার পাননি। ১৫-২০ মিনিট ধরে রবিনকে পেটানোর পর এসআই সুজন থানা থেকে বের হয়ে তাকে পরদিন আদালত থেকে ছেলেকে জামিন করিয়ে নেওয়ার কথা বলেন। তিনি আদালতে গিয়ে জানতে পারেন, তার ছেলের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য আইনে মামলা দেওয়া হয়েছে। ঐ মামলায় আদালত রবিনকে কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায় । এদিকে, পল্লবী থানায় এসআই সুজন বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায় বলা হয়েছে, গত ৪ মার্চ সন্ধ্যার দিকে পল্লবীর ই-ব্লকের কালশী কবরস্থানের সামনে এএসআই মাসুদ রানা, কনস্টেবল গোলাম মোস্তফা ও আনসার সদস্য সামসুল হকসহ ডিউটি করার সময় এক ব্যক্তিকে ধাওয়া করে আটক করেন। তার প্যান্টের পকেটে পলিথিনে মোড়ানো ২১৫ গ্রাম হেরোইন ও ১৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট পাওয়া যায়। ঐ ব্যক্তির নাম রবিন আহমেদ রাশেদ (২৫)। সে এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী।

এসআই সুজন বলেন, ‘রবিন একজন মাদক ব্যবসায়ী। এটা পুলিশের সবাই জানেন। রবিনের বিরুদ্ধে এক বাড়ির মালিক ৪০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন। ঐ অভিযোগ তদন্ত চলাকালে আমি রবিনকে মাদকসহ আটক করি। এ খবর বাড়ির মালিক পাওয়ার পর তিনি তার টাকা ফেরত চান। পুলিশ রবিনের মায়ের কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ির মালিককে ফেরত দিয়েছে।’ পল্লবী থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী বলেন, রাজিয়া সুলতানার অভিযোগ নথি পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।