সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। খোদ প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এই অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন। ঐ নির্দেশের পরই গত বুধবার দুই জন আইনজীবীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ঘুষ গ্রহণের অপরাধে দুই জন অ্যাফিডেভিট কমিশনারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দায়ের করা হয়েছে বিভাগীয় মামলা। এছাড়া গত রবিবার দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বেঞ্চ অফিসার মো. মুর্শেদুল হাসানকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে এই অভিযান আরো জোরালো হবে বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন সূত্র।
এ প্রসঙ্গে হাইকোর্টের স্পেশাল অফিসার মো. সাইফুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, যে কোনো দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন প্রধান বিচারপতি। তিনি ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে সেভাবেই সার্বক্ষণিক নির্দেশনা দিচ্ছেন।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে বিভিন্ন শাখায় বসানো হয়েছিল ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা। কিন্তু সিসি ক্যামেরার নজরদারির বাইরে গিয়ে ঘুষ গ্রহণে লিপ্ত হচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। আবার অনেক কর্মকর্তা ঘুষ নিচ্ছেন বিকাশের মাধ্যমে। মামলা দায়ের থেকে শুরু করে রায় বা আদেশের অনুলিপি পেতে সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সীমাহীন এই দুর্নীতির কারণে নাজেহাল হচ্ছেন আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা।
সাধারণ আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আদালতে একটি নতুন মামলা দায়ের করতে গেলে প্রথমে স্ট্যাম্প দিয়ে কোর্ট ফি এন্ট্রি করতে হয়। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ফির অতিরিক্ত টাকা উেকাচ হিসাবে দিতে হয়। এরপর দেওয়া হয় মামলার নম্বর। সেখানেও আর্থিক লেনদেন করে কাজ করাতে হয়। নম্বর পাওয়ার পর নথিটি যায় অ্যাফিডেভিট কমিশনারের কাছে। সেখানেও তদবির করতে হয়, দিতে হয় অর্থ। তারপর মেনশন করে আদালতে মোশন (নতুন আবেদন) জমা দেওয়ার পর কার্যতালিকায় আনতে অনেক কোর্টে বেঞ্চ অফিসারদের সঙ্গে করতে হয় বড় অঙ্কের অবৈধ আর্থিক লেনদেন। যার ফলে মোশন মামলা আদালতের কার্যতালিকায় ক্রমিক নম্বর অনুযায়ী না দিয়ে বরং বেঞ্চ অফিসারের ইচ্ছেমতো দেওয়া হয়। তারপর শুনানির দিনে আর্থিক লেনদেন ছাড়া সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে ফাইল আসে না বললেই চলে। এই প্রতিটি ধাপে বিচারপ্রার্থীদের বাধ্য হয়ে বিভিন্ন অঙ্কের অর্থ দিতে হচ্ছে।
আবার শুনানি শেষে আদেশ হওয়ার পর আদেশের অনুলিপি পেতেও বেঞ্চ অফিসারকে দিতে হয় উেকাচ। নইলে বিলম্ব হয় আদেশ টাইপের ক্ষেত্রে। এভাবে এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ফাইল স্থানান্তর করতেও বিচারপ্রার্থীকে তদবিরের নামে অনৈতিক লেনদেনে জড়াতে হয়। সর্বশেষ ডেসপাচ শাখায় উেকাচ দিলে তবেই মামলার আদেশের কপি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে পৌঁছায়। অন্যথায় আদেশটি মাসের পর মাস কিংবা বছর পেরিয়ে গেলেও পড়ে থাকে সংশ্লিষ্ট শাখায়।
আইনজীবী সহকারীরা জানিয়েছেন, মামলার ধরন ও মক্কেলের আর্থিক সংগতির ওপর এই উেকাচের পরিমাণ ওঠানামা করে। তারা জানিয়েছেন, ৫০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধাপে ধাপে দিতে হয় ১০ হাজার টাকা বা তার চেয়েও বেশি পরিমাণ অর্থ।
এসব অভিযোগ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিও। এর আগে সমিতির পক্ষ থেকেও সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রকাশ্য দুর্নীতি ও অনিয়মসংক্রান্ত অভিযোগ প্রধান বিচারপতির কাছে পেশ করা হয়। তখন বার নেতৃবৃন্দকে প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, ‘ঢালাও নয়, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিন। দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলেই আমি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেব। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’ এর পরই আইনজীবী সমিতি দুর্নীতি ও অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্য চেয়ে সমিতি কার্যালয়ে স্থাপন করে অভিযোগ বাক্স। এরপর গত বুধবার দুই জন আইনজীবী অ্যাফিডেভিট শাখায় ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলকে অবহিত করেন। এর পরই বার সম্পাদক ঐ দুই আইনজীবী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ও এ জেড এম নুরুল আমিনকে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. আলী আকবরের কার্যালয়ে যান এবং বিস্তারিত ঘটনা জানান। তখনই বিষয়টি প্রধান বিচারপতিকে অবহিত করলে তিনি সংশ্লিষ্ট শাখায় তাত্ক্ষণিক অভিযানের নির্দেশ দেন। ঐ নির্দেশ পেয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেলের নেতৃত্বে একটি টিম অভিযান পরিচালনা করে।
যেভাবে ঘুষ গ্রহণ করা হচ্ছিল :সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানায়, সম্প্রতি আইনজীবী এ জেড এম নুরুল আমিনের ক্লার্ক মামলার অ্যাফিডেভিট করতে গেলে অ্যাফিডেভিট সেকশনের একজন কর্মচারী একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে সেই নম্বরে বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে বলেন। এরপর ঐ ক্লার্ক সংশ্লিষ্ট ঐ মোবাইল নম্বরে ৫০০ টাকা পাঠান। পরে বুধবার বিকালে অভিযানকালে ঐ নম্বরে ফোন দিয়ে দেখা যায় মোবাইল নম্বরটি অ্যাফিডেভিট সেকশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা খান মো. সেরাজুল ইসলামের। সেরাজুল ইসলাম আলামত নষ্টের জন্য রেজিস্ট্রার বইয়ের প্রথম পাতা ছিঁড়ে ফেলেন। পরে তার মোবাইলটি জব্দ করে পরীক্ষা করা হয়। ঐ পরীক্ষায় দেখা যায় যে অভিযুক্ত সেরাজুল ঐদিন বিকাশের মাধ্যমে ১৩ হাজার ১৮০ টাকা গ্রহণ করেছেন। পরে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে না পারায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
এছাড়া একই দিন দায়িত্ব পালনকালে অ্যাফিডেভিট কমিশনার মো. আব্দুর রশিদের কাছ হতে ১ হাজার ৫০০ টাকা জব্দ করে অভিযান পরিচালনাকারী টিম। জব্দকৃত টাকাগুলোর বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে উনি স্বীকার করেন যে ঐ টাকা আইনজীবী সহকারীর কাছ হতে গ্রহণ করেছেন। যা অসদাচরণ, দুর্নীতি ও অফিসশৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজ। এ কারণে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে তাকেও সাময়িক বরখাস্ত করে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।
এ প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ইত্তেফাককে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের যে কোনো পর্যায়ের ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। দু্ই জন আইনজীবীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন দুই জন কর্মকর্তাকে হাতেনাতে ধরেছেন। পুরো ঘটনাটি আমি ভিডিও করেছি এবং প্রশাসনকে দিয়েছি।