মহামারি করোনার কারণে বেকার হয়ে পড়া অনেক শ্রমজীবী মানুষ এখনো ফিরতে পারেনি কাজে। স্বল্প আয়ের এসব মানুষের এতদিন ভরসা ছিল ভাতের সঙ্গে একটু সবজি। কিন্তু দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে টানা তিন দফা বন্যায় সেই ভরসাটুকুও এখন নেই। কারণ, বন্যায় সবজিখেত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সবজির দাম এখন আকাশছোঁয়া। যে সবজির কেজি বন্যার আগে বিক্রি হয়েছে ২৫ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে এখন তা ৬০ থেকে ৮০ টাকা।
চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলের শুরুতে যখন দেশে করোনা ভাইরাস হানা দেয়, তখন মানভেদে প্রতি কেজি চালের দাম ছিল ৩৮ থেকে ৫৮ টাকার মধ্যে কিন্তু এখন তা ৪৪ থেকে ৬৪ টাকা। সদ্য সমাপ্ত বোরো মৌসুম শেষ না হতেই চালের দাম বাড়তে শুরু করেছে। সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) গতকাল শুক্রবারের দৈনন্দিন বাজারদরের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহের মধ্যে মানভেদে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে চার থেকে পাঁচ টাকা বেড়েছে। দাম বাড়ার তালিকায় আরো রয়েছে সয়াবিন তেল, মুগ ও অ্যাংকর ডাল।
গতকাল রাজধানীর কাওরানবাজার, শান্তিনগর ও মহাখালী কাঁচাবাজারে খোঁজ নিয়ে বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার এ তথ্য পাওয়া যায়। শান্তিনগর বাজারের সবজি ব্যবসায়ী আনিছার বলেন, বন্যার কারণে অনেক সবজিখেত নষ্ট হয়ে গেছে। বলা যায়, চাহিদার চারভাগের একভাগ সবজি বাজারে আসছে। তাই এত দাম। গতকাল বাজারে বিভিন্ন ধরনের সবজির মধ্যে কাঁকরোল, পটোল, ঝিঙা ৬০ থেকে ৭০ টাকা, বেগুন, বরবটি, করল্লা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, চিচিঙ্গা, ঢ্যাঁরশ ৫০ থেকে ৬০ টাকা, টমেটো ১০০ থেকে ১২০ টাকা, কচুর লতি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, গাজর ৮০ থেকে ১০০ টাকা, কাঁচামরিচ ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এই সবজি বিক্রেতা বলেন, বন্যা না কমলে সবজির দাম কমার সম্ভাবনা নেই।
এদিকে সবজির পাশাপাশি এক সপ্তাহের মধ্যে হঠাত্ করে আরো এক দফা চালের দাম বাড়ায় স্বল্প আয়ের মানুষের কষ্ট যেন আরো বেড়েছে। গতকাল বাজারে মোটা চাল ইরি/স্বর্ণা ৪৪ থেকে ৪৮ টাকা, মাঝারিমানের চাল পাইজাম/লতা ৪৮ থেকে ৫৫ টাকা ও সরু চাল নাজিরশাইল/মিনিকেট ৫৪ থেকে ৬৪ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, চার দিন আগেও সবধরনের চাল কেজিতে চার থেকে পাঁচ টাকা কমে বিক্রি হয়েছে।
চালের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের রেহান অটো রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী আব্দুস সামাদ আকন্দ ইত্তেফাককে বলেন, ধানের দাম বাড়তি, তার পরও আমদানি কম। বর্তমানে প্রতি মণ কাটারিভোগ ধান ১ হাজার ২০ থেকে ১ হাজার ৩০ টাকা, মিনিকেট ১ হাজার ১২৫ থেকে ১ হাজার ১৩০ টাকা ও মোটা ধান ৯৫০ থেকে ১ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যা গত বছরের তুলনায় প্রতি মণ ধানে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বেশি। এর প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে আয়োজিত এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, দেশে তিন দফা বন্যায় ৩৭টি জেলার মোট ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৪৮ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আমন ধানের। মোট ৭০ হাজার ৮২০ হেক্টর জমির আমন ফসল নষ্ট হয়েছে। এছাড়া ৩২ হাজার ২১৩ হেক্টর জমির ৩৩৪ কোটি টাকার আউশ ধান এবং ৭ হাজার ৯১৮ হেক্টর জমির আমন বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, বন্যায় ফসলের যে ক্ষতি হয়েছে, তাতে খাদ্য উত্পাদনে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না। আমরা ঝুঁকিতে পড়ব না। তবে প্রয়োজনে চাল আমদানি করা হবে। এজন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছে।
দাম বেড়েছে সয়াবিন তেলের। গতকাল বাজারে পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলে ১০ টাকা বেড়ে ৪৮০ থেকে ৫১০ টাকা ও প্রতি লিটার খুচরা সয়াবিন তেলে ২ টাকা বেড়ে ৮৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে নতুন করে প্রতি লিটারে পাঁচ টাকা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে ভোজ্যতেল কোম্পানিগুলো। চলতি সপ্তাহে কোম্পানিগুলো এই দর বাড়াতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তেলের পাশাপাশি বাজারে মুগ ও অ্যাংকর ডালের দাম বেড়েছে। কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি মুগ ডাল ১১০ থেকে ১২০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া অ্যাংকর ডাল কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
করোনা পরিস্থিতিতে এভাবে বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় শ্রমজীবী মানুষের পাশাপাশি স্বল্প বেতনের চাকরি করেন এমন মানুষও ভোগান্তিতে পড়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যাংকার বলেন, করোনার কারণে আমাদের বেতন কমেছে। কিন্তু বাসভাড়া ও জিনিসপত্রের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বিভিন্ন বিষয়ে কাটছাঁট করেও এখন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি।