চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার জট কমাতে নানা উদ্যোগ

চট্টগ্রাম বন্দরের ক্রমবর্ধমান আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে প্রতিবছর কনটেইনার হ্যান্ডলিং বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিবছর আট থেকে দশ ভাগ কনটেইনার বৃদ্ধির কারণে এর হ্যান্ডলিং সক্ষমতা এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষও নতুন নতুন পরিকল্পনার কথা বিবেচনায় নিচ্ছে। কনটেইনার জট কমাতে নেওয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। এদিকে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ বন্দরের কনটেইনার জট কমানোর জন্য বিভিন্ন দেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ খাতে বিশাল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগেরও প্রস্তাব দিয়ে আসছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের চেয়ে বন্দরের ভেতরে কনটেইনার রাখা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। আমদানি পণ্য খালাস প্রক্রিয়া কোনো কারণে বিঘ্ন ঘটলে বন্দরে অস্বাভাবিক অবস্থার সৃষ্টি হয়। জেটিতে কনটেইনার জটের ফলে বন্দরের হ্যান্ডলিং কার্যক্রম ব্যাহত কিংবা বন্ধের উপক্রম হয়। গত ২৬ মার্চ থেকে কোভিড-১৯-এর কারণে সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পর চট্টগ্রাম বন্দরে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে বন্দরে আসা স্বল্পসংখ্যক জাহাজকেও সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আমদানিকারকগণ তাদের পণ্যবাহী কনটেইনার খালাস কমিয়ে দেওয়ায় বন্দরের জেটিতে কনটেইনারের স্তূপ জমতে থাকে। একসময় বন্দরের ধারণ ক্ষমতা অতিক্রম করে। ভাড়া মওকুফসহ অনেক বিকল্প পন্থা গ্রহণ এবং সবশেষ সব পণ্য বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর বন্দরে স্বস্তি ফিরে আসে। কারণ পূর্বে শুধু ৩৭টি পণ্য বেসরকারি আইসিডিতে নিয়ে খালাস করা যেত। তবে শুধু করোনা ভাইরাস নয়, প্রতিবছর কোনো না কোনো সময় বন্দরে কনটেইনার জটের সৃষ্টি হয়।

কর্তৃপক্ষ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বন্দরের ভেতর থেকে সব কনটেইনার বাইরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে নির্মাণাধীন বে-টার্মিনাল এলাকায় ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মাধ্যমে জাহাজ থেকে কনটেইনারসমূহ নামার পর সব কনটেইনার সরাসরি বে-টার্মিনাল ইয়ার্ডে চলে যাবে। ঐ ইয়ার্ড থেকে আমদানিকারকগণ তাদের কনটেইনার কিংবা পণ্য নিয়ে যাবেন। এতে বন্দরের জেটিতে কোনো কনটেইনার না থাকায় কনটেইনার হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট চলাচল সহজ হবে। এর ফলে বন্দরের হ্যান্ডলিং ক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

বন্দর থেকে কনটেইনার নির্বিঘ্নে ডেলিভারি ইয়ার্ডে পৌঁছানোর জন্য এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঈগল ট্রেন কোম্পানি আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ ঐ কোম্পানির সঙ্গে একাধিক বৈঠকও করেছে বলে জানা যায়। বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ অবকাঠামো উন্নয়নে দুবাই পোর্ট পরিচালনাকারী সংস্থা ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রায় ১০০ মিলিয়ন বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলেও জানা যায়। ডিপি ওয়ার্ল্ড চট্টগ্রাম বন্দরের হ্যান্ডলিং ক্ষমতা শতকরা ৩০ ভাগ বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ভারতের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন ও কনটেইনারসমূহ বন্দর থেকে বের করে নিয়ে আমদানিকারকের গন্তব্যে পৌঁছার ক্ষেত্রে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে বলে সূত্রে জানা যায়।

বন্দর সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ সূত্রসমূহের মতে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার জট কমানো এবং একই সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে কনটেইনারবাহী ট্রাক-লরি-কাভার্ড ভ্যান চলাচল কমানোর জন্য রেলপথে কনটেইনার পরিবহন বাড়ানোর অনেকগুলো পরিকল্পনা নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কনটেইনার সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য একটি কোম্পানিও গঠন করে। বন্দরসংলগ্ন এলাকায় রেলওয়ের জমিতে কনটেইনার ইয়ার্ড নির্মাণের জায়গা নির্দিষ্ট করা হয়। এছাড়া গাজীপুর সংলগ্ন ধীরাশ্রম এলাকায় একটি কনটেইনার ডিপো নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কেননা কমলাপুর রেলওয়ে কনটেইনার ডিপো ঢাকা শহরের মধ্যে স্বল্প পরিসরের জায়গার ওপর নির্মিত যা কোনোভাবেই পর্যাপ্ত নয় বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে ডাবল লাইন হওয়ায় রেলপথে কনটেইনার কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। বর্তমানে বন্দর থেকে প্রতিদিন ১২০টি কনটেইনার পরিবহন করা হয়। তা রেলের ডাবল লাইন ব্যবহার করে ১ হাজারে উন্নীত করা সম্ভব। এতে বন্দরে কনটেইনার চাপ যেমন কমবে, তেমনি সড়কপথে ট্রাক, লরি, কাভার্ড ভ্যান চলাচল হ্রাস পাবে। আবার আমদানিকারকগণ স্বল্প সময়ের মধ্যে তাদের কনটেইনার ও পণ্য পাবেন।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম ইত্তেফাককে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকামুখী কনটেইনারের গতি বৃদ্ধিতে রেলওয়েকে এগিয়ে আসতে হবে। পূবাইল সংলগ্ন ধীরাশ্রম ডিপো নির্মাণ এবং রেলের ডাবল লাইন সুবিধা কাজে লাগিয়ে কনটেইনারবাহী ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি।