কয়রায় আম্ফানের পর করোনা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা
এনামুল হক, খুলনা অফিস
‘করোনার মধ্যি মাত্রর ১০ কেজি চাল পাইছি। সাহায্য বলতি আর কিছুই পাইনি। তিন বছর ধরে স্বামী গোলাম রসুলও কোনো খোঁজ-খবর নেয় না। চার ছাওয়াল-মায়ে আর এক নাতি নিয়ে বড়ো কষ্টে আছি বাবা। মানুষির দ্বারে দ্বারে যাইয়েও ভিক্ষে পাওয়া যাচ্ছে না। কারুর বাড়িতিও কোনো কাজ নেই। কালকে রাত্তিরি এক মুঠ ভাত খাইছি। আজ দুপুর গড়ায় গেছে কিছুই খাইনি। শুনিছি, এই স্কুলি সাহায্য দেবে তাই সকাল থেকে বসে আছি।’ কয়রা উপজেলা সদরের দুই নম্বর কয়রা গ্রামের বৃদ্ধা সাঈদা বেগম এভাবেই তার কষ্টের কথা বলছিলেন। কয়রা গ্রামের স্বামী পরিত্যক্তা শাহানারা বেগম (৪০) বলেন, এমনিতেই কয়রার মানুষ গরিব। তার ওপর করোনা শুরু হওয়ার পর কোনো কাম-কাইজও নেই। আমাগের মতো গরিব মানুষির কষ্টের কথাও কেউ শুনতি চায় না। আমরা কি কইরে বাঁচে থাকব, তাই নিয়েই চিন্তাই আছি।’
সুপার সাইক্লোন আম্ফান বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের উপকূল অঞ্চল কয়রাবাসীকে সর্বহারা করে দিয়েছে। তার মধ্যে মহামারি করোনা ভাইরাস মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২০ মে রাতে সুন্দরবন উপকূলে আঘাত হানে সুপার সাইক্লোন আম্ফান। এর প্রভাবে উপজেলার কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে মুহূর্তের মধ্যে ভাসিয়ে দেয় এ উপজেলার চারটি ইউনিয়ন। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়ে লক্ষাধিক মানুষ। এখনো উত্তর বেদকাশী ইউনিয়ন লবণ পানিতে তলিয়ে আছে। এর রেশ না কাটতেই ছড়িয়ে পড়ে করোনা ভাইরাস। পেটের ক্ষুধা নিবারণে পুরুষরা এলাকার বাইরে যেতে পারলেও চরম সমস্যায় পড়েছে নারী ও শিশুরা। করোনার কারণে কোনো কাজকর্মও নেই এই উপজেলায়। ফলে গত পাঁচ মাস ধরে এ উপজেলার নারী ও শিশুদের জীবন কাটছে অর্ধাহারে-অনাহারে।
গত বুধবার দুপুরে কয়রা উপজেলা সদরের মদিনাবাদ মডেল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বেসরকারি সংস্থা ফেইথ ইন অ্যাকশন ৯০জন হতদরিদ্র মানুষকে ঘর নির্মাণের জন্য টিন, খাদ্যসামগ্রী, কৃষি পুনর্বাসন সামগ্রী ও খাদ্যসামগ্রী সহায়তা প্রদান করে। সরেজমি দেখা যায়, প্রায় ২০০ নারী-পুুরুষ জড়ো হয়েছেন সেখানে। ফলে অর্ধেক মানুষই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হয়। গৃহবধূ পাপিয়া খাতুন বলেন, খিদের জ্বালায় এই খানে ত্রাণ নিতি আইছি। কোলে রাখা আড়াই বছরের ছেলেকে দেখিয়ে বলেন, আমার এই শিশু সন্তানটিও না খেয়ে আছে। স্বামী ফয়সাল সরদার দিনমজুরি করে যা পায় তা দিয়েই খেয়ে-না খেয়ে আমাদের সংসার চলে। আবার যে দিন তার কাজ জোটে না, সেদিন আমাদের উপোস থাকতি হয়’।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, কয়রায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ জরুরি। এখানে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ হলে আর মানুষের জমিঘর প্লাবিত হবে না। লবণ পানিতে ফসলেরও ক্ষতি হবে না। তখন এখানকার মানুষ শান্তিতে থাকতে পারবে।