গ্যাস সিলিন্ডার চাই! গ্যাস সিলিন্ডার! চাহিবামাত্র আপনি দেশের বহু এলাকায় যত্রতত্র গ্যাস সিলিন্ডার পাইবেন। সরকারি নীতিমালাকে তোয়াক্কা না করিয়া এলপি গ্যাস সিলিন্ডার দেদার বিক্রয় করা হইতেছে মুদি দোকান, হার্ডওয়ারের দোকান, ফ্লেক্সিলোডের দোকান, মেশিনারি দোকান, সারের ডিলার, এমনকি চা দোকানেও। অরক্ষিত অবস্থায় যত্রতত্র সিলিন্ডার ফেলিয়া রাখিয়া বিক্রয়ের কারণে যে কোনো মুহূর্তে ঘটিতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। সত্যিকার অর্থে মাঝেমধ্যে এমন দুর্ঘটনা ঘটিয়াও থাকে। তাহার প্রমাণ পাওয়া যাইবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে গেলে। রাজধানী ঢাকাসহ সমগ্র দেশ হইতে গড়ে প্রতি মাসে পাঁচ শতাধিক আগুনে পোড়া রোগী বার্ন ইউনিটে ভর্তি হইয়া থাকে। ইহার মধ্যে ৪২ শতাংশই গ্যাসের আগুনে দগ্ধ।
সিলিন্ডার গ্যাসের আগুনের বিপদ হইল, সাধারণ আগুনের চাইতে ইহার আগুন অনেক বেশি তীব্র হয়। আগুনের তীব্রতা অধিক হইবার কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিরা মারাত্মক দগ্ধ হয়। গ্যাসের আগুনে রোগীর শ্বাসনালি সাধারণত অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ বিশেষ কিছু নিয়মনীতি মানিয়া বিক্রয় ও ব্যবহার করিলেই গ্যাস সিলিন্ডারের বিপদ হইতে মুক্তি পাওয়া যায়। নিয়ম অনুযায়ী গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রয় ও মজুত স্থানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের প্রয়োজন হয়। প্রয়োজন হয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতারও। এই ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিস লাইসেন্স, জ্বালানি অধিদপ্তরের লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র লইবারও বিধান রহিয়াছে। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, খুচরা দোকানে বিক্রয়ের জন্য সর্বোচ্চ ১০টি গ্যাস সিলিন্ডার রাখা যায়। ১০টির অধিক গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করিতে হইলে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক; কিন্তু কে শোনে এই নিয়ম? পত্রিকায় নিয়মিতই প্রকাশ হইতেছে যত্রতত্র গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রয়ের সংবাদ। বাড়িতেছে দুর্ঘটনার সংখ্যাও। দুঃখজনকভাবে কোনো দুর্ঘটনাতেই কাহারো সাজা পাইবার পরিসংখ্যান নাই। আমরা মনে করি, ইহা তদারক সংস্থার একধরনের দায়িত্বহীনতা। শুধু দায়িত্বহীনতা ও অসচেতনতাই নহে; মেয়াদোত্তীর্ণ, মানহীন সিলিন্ডার তৈরি ও সরবরাহ, সিলিন্ডারের সহিত চুলার সংযোগ পাইপ সঠিক ফিটিংস না হওয়া এবং নিয়মিত মনিটরিং না করাটাও অনেক দুর্ঘটনার নেপথ্য কারণ।
নিয়ম অনুযায়ী ১০ বত্সর পরপর বিস্ফোরক অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে গ্যাস সিলিন্ডার রি-টেস্ট (পরীক্ষণ) করাইতে হয়। রি-টেস্টে উত্তীর্ণ হইলে প্রতিটি সিলিন্ডার পরবর্তী ১০ বত্সর পর্যন্ত ব্যবহারের অনুমোদন পায় উত্পাদন ও বিতরণ কোম্পানিগুলি। যেহেতু গ্রাহক পর্যায়ে সিলিন্ডার নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি অধিদপ্তরের পক্ষে সম্ভব নহে, সেহেতু কোম্পানিগুলির স্টোর পর্যন্ত এই মান নিয়ন্ত্রণ করা উচিত; কিন্তু ফিলিং স্টেশন, স্টোর কিংবা ডিলার পর্যায়ে অনেক সময় এই বিষয়গুলি এড়াইয়া যাওয়া হয়। ফলে গ্রাহক পর্যায়ে চলিয়া যায় ত্রুটিপূর্ণ, মেয়াদোত্তীর্ণ বা ক্ষতিগ্রস্ত সিলিন্ডার। আর তাহা যদি যত্রতত্র বিক্রয়ের জন্য রাখা হয়, তবে সেই সকল গ্যাস সিলিন্ডার হইতে যে কোনো সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটিতে পারে। দুঃখজনক হইলেও সত্য, এই বিষয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত সংবাদ প্রকাশের পরেও দেশের যত্রতত্র গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রয় অব্যাহত রহিয়াছে। ইহাকে কি কেবল দায়িত্বহীনতা বা অবহেলা বলা যাইবে?