বেনজীর আহমেদ সিদ্দিকী
পাখির বাসা অপূর্ব স্থাপত্যশিল্প। একটা ছোট্ট পাখি শুধু তার ঠোঁট ও পায়ের নখ ব্যবহার করে কিভাবে এত সুন্দর এবং নিখুঁত বাসা বানাতে পারে! অনেক প্রাণিবিজ্ঞানী, প্রকৃতিবিজ্ঞানী ও স্থাপত্যবিদের কাছে তা এক অপার বিস্ময়।
পাখিদের কেউ কাদা দিয়ে, কেউ ডালপালা দিয়ে, কেউ ঘাস, খড়বিচালি দিয়ে আবার কেউ নিজের লালা ও গায়ের পালক দিয়ে বাসা বানায়। এসব বাসার গড়নও বিভিন্ন রকমের; কোনো বাসা লম্বা চোঙার মতো, কোনো বাসা সমতল, কোনো বাসা ঝুড়ির মতো আবার কোনো বাসা গোলাকার। পাখিরা এমনভাবে বাসা তৈরি করে যাতে বাইরের কোনো বিপদ থেকে নিজেদের রক্ষা করা যায়। তাই অনেক পাখি বাসায় ঢোকার রাস্তা তলার দিকে করে। অনেক সময় বাসার গায়ে আরো একটা গর্তের মতো মুখ তৈরি করে রাখে, সেটা কেবলই দেখানোর জন্য, তার ভেতর দিয়ে বাসায় ঢোকা যায় না।
দোলনার মতো বাসা বানাতে টুনটুনি পাখি দুই-তিনটি পাতা সেলাই করে ছোট্ট একটা বাটির মতো তৈরি করে এবং তার মাঝে নরম ঘাস-পাতা দিয়ে রাখে। দোয়েল অন্য পাখিদের বাসায় হানা দিতে বেশ ওস্তাদ। এরা কাঠঠোকরা, টিয়া, বসন্তবৌরি ইত্যাদি পাখির বাসা দখল করে থাকতে শুরু করে, আবার নিজেরাও বাসা বানায়। এরা বাঁশের মাথার গর্তে, সুপারি গাছের গর্ত ছাড়াও দালানের ফাঁকফোকর, গাছের কোটর, ফেলে দেওয়া হাঁড়ি-কলসির ভেতরও বাসা করে। এসব বাসা বাটির মতো—আবার চায়ের কাপের মতোও হতে পারে। খড়ের গাদা, বিদ্যুতের খুঁটি, ভেন্টিলেটর, হাঁড়ি-কলসির ভেতরে চড়ুই, শালিক, ফিঙে বাসা তৈরি করে। কাঠঠোকরা সাধারণত ঠোঁট দিয়ে ঠোকর মেরে গাছের গায়ে গর্ত করে তার ভেতর বাসা বানায়। এর মধ্যে ঘাস, খড় দিয়ে বিছানা করে।
বাবুই পাখির বাসা তৈরির কৌশলের কারণে তাকে ‘তাঁতিপাখি’ও বলা হয়। তাল, নারকেল, খেজুর, সুপারি, রেইনট্রি গাছে দলবেঁধে বাসা বোনে। এদের বাসার গঠন বেশ জটিল, কিন্তু খুব সুন্দর। অনেকটা উলটানো কলসির মতো। ঠোঁট দিয়ে ঘাসের আস্তরণ ও কাদার মিশ্রণ করে পেট দিয়ে ঘষে ঘষে গোলাকার অবয়ব মসৃণ করে তোলে। শুরুতে নিম্নমুখী দুটি গর্ত থাকে। পরে একদিক বন্ধ করে ডিম রাখার জায়গা করে। অন্যদিকটি লম্বা করে প্রবেশ ও প্রস্থান পথ বানায়। একটি বাসা তৈরি হতে ১০-১৫ দিন সময় লাগে।
বড় বা মাঝারি গাছের মাথায় শুকনো ও কাঁচা ডালপালা দিয়ে বাসা বানায় ঈগল, চিল, পানকৌড়ি ও বক। মাঝেমধ্যে খড়, প্লাস্টিক ঠোঁট, পায়ের নখ দিয়ে বয়ে এনে বিছিয়ে দেয়, যাতে বাসা শক্ত এবং আরামদায়ক হয়।
জলের নানা উদ্ভিদ যেমন কচুরিপানা, শাপলা, পদ্ম, কলমি, হেলেঞ্চার ঝোপে খড়কুটো, শুকনো পাতা, বাঁশের শেকড় ও পাতা, কচুরিপানার শেকড়, পাটের আঁশ, শেওলা, পানির ঘাস দিয়ে বাসা বানায় ডাহুক, কালিম ও বেশ কিছু জলচর পাখি। পানির স্রোতে কলমি বা কচুরিপানার সঙ্গে এসব পাখির বাসাও ভেসে যেতে থাকে। মাটির গর্তের মাঝে বাসা বানাতে পটু মাছরাঙা, কাদাখোঁচা ও সুইচোরাসহ জলজ সব পাখি। মাছরাঙা মাটির ঢালে, উঁইয়ের ঢিবিতে অন্য পাখির খোঁড়া গর্ত কিংবা গাছের পচা-গুঁড়ির ফোকরে বাসা বাঁধে। স্ত্রী-পুরুষ পাখি উভয়েই ঠোঁট দিয়ে মাটি বা পচা কাঠ আলগা করে গর্ত খোঁড়ে এবং পায়ের সাহায্যে মাটি বা কাঠের গুঁড়ো গর্তের বাইরে ছুড়ে ফেলে বাসা বানায়।