বহুল আলোচিত কক্সবাজারের টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ ও তার স্ত্রী চুমকি কারণের বিরুদ্ধে প্রায় ৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে ৩ কোটি ৯৫ লাখ ৫ হাজার ৬৩৫ টাকা ‘ওসি প্রদীপ’ ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করেছেন বলে দুদক অভিযোগ এনেছে। আর ১৩ লাখ ১৩ হাজার ১৭৫ টাকার সম্পদের তথ্য সম্পদ বিবরণীতে গোপন করার অভিযোগ আনা হয়েছে চুমকির বিরুদ্ধে। প্রদীপ ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করে স্ত্রীর নামে তা হস্তান্তর ও স্থানান্তর করেছেন বলেও দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদন এবং এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
গতকাল রবিবার দুদকের চট্টগ্রাম জেলা সমন্বিত কার্যালয়-২ এর উপসহকারী পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন মামলাটি করেছেন। ঘটনাস্থল বিবেচনায় মামলাটি করা হয়েছে দুদকের চট্টগ্রাম জেলা সমন্বিত কার্যালয়-১ এ। মামলায় বাদী এজাহারে আসামি চুমকি ও প্রদীপ কুমার দাশের বিরুদ্ধে দুদক আইন, ২০০৪ এর ২৬ (২) ও ২৭ (১), মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪ (২) ধারা, ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারা এবং দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় অভিযোগ এনেছেন।
এ ব্যাপারে মামলার বাদী দুদক কর্মকর্তা রিয়াজ উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, প্রদীপের স্ত্রী চুমকি কারণের কাছে যখন সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, একই সঙ্গে প্রদীপ কুমার দাশকেও দেওয়া হয়েছিল। প্রদীপও সম্পদ বিবরণী জমা দিয়েছেন। সেই বিবরণী যাচাই-বাছাই চলছে। এ মামলা শুধু চুমকির সম্পদ বিবরণীর ভিত্তিতে করা হয়েছে। টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ এবং তার স্ত্রী ?চুমকি কারণের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের উেসর সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় মামলা করা হয়েছে।
সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত প্রদীপ কুমার দাশ চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী ইউনিয়নের উত্তর সারোয়াতলী গ্রামের মৃত হরেন্দ্র লাল দাশের পুত্র। নগরীর কোতোয়ালি থানার পাথরঘাটা আর সি চার্চ রোডে তাদের নিজস্ব একটি আবাসিক ভবন আছে। সেই ভবনে তার স্ত্রী চুমকি কারণ সন্তানদের নিয়ে বসবাস করেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, চুমকি কারণ দুদকে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ১৩ লাখ ১৩ হাজার ১৭৫ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। এছাড়া ৩ কোটি ৯৫ লাখ ৫ হাজার ৬৩৫ টাকার জ্ঞাত আয়ের উেসর সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রমাণ হয়েছে, যা ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করে পরস্পর যোগসাজশের মাধ্যমে হস্তান্তর ও স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে ভোগদখল করছেন।
দুদক কর্মকর্তা জানান, ২০১৯ সালের ১১ এপ্রিল দুদকের চট্টগ্রাম জেলা সমন্বিত কার্যালয়-২ থেকে চুমকি কারণের কাছে সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার নোটিশ পাঠানো হয়। ১২ মে তিনি সম্পদ বিবরণী দুদকে জমা দেন। এতে তিনি ৩ কোটি ৬৬ লাখ ৫১ হাজার ৩০০ টাকা স্থাবর এবং ৪২ লাখ ৮৪ হাজার ৩৯৪ টাকার অস্থাবরসহ মোট ৪ কোটি ৯ লাখ ৩৫ হাজার ৬৯৪ টাকার সম্পদের তথ্য উল্লেখ করেন। কিন্তু দুদকের অনুসন্ধানে চুমকি কারণের নামে ৩ কোটি ৬৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৭৫ টাকার স্থাবর এবং ৫৬ লাখ ২৪ হাজার ৩৯৪ টাকার অস্থাবরসহ মোট ৪ কোটি ২২ লাখ ৪৮ হাজার ৮৬৯ টাকার সম্পদের হিসাব উঠে আসে। এ হিসেবে এজাহারে ১৩ লাখ ১৩ হাজার ১৭৫ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
সম্পদ বিবরণীতে চুমকি কারণ তার বাবার কাছ থেকে দান হিসেবে পাওয়া জমিসহ একটি ছয়তলা বাড়ির তথ্য দেন। দুদক অনুসন্ধানে পেয়েছে, চুমকি কারণের বাবা সাবরেজিস্ট্রি দলিলমূলে তাকে বাড়ি দিলে তার অপর দুই ভাই ও এক বোনকে কোনো বাড়ি দেননি। অথচ দুই ছেলের নামে উল্লেখযোগ্য কোনো সম্পদও নেই। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওসি প্রদীপ তার ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অপরাধলব্ধ অর্থ গোপন করার অসত্ উদ্দেশ্যে স্থানান্তর ও হস্তান্তরের মাধ্যমে তার শ্বশুরের নামে বাড়ি নির্মাণ করে পরবর্তী সময় স্ত্রী চুমকি কারণের নামে দান করিয়ে নিয়ে ভোগদখল করছেন।
সম্পদ বিবরণীতে চুমকি কারণ মাছের ব্যবসা থেকে দেড় কোটি টাকা আয় দেখিয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি ২০০২ সালে ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী ইউনিয়নের উত্তর সারোয়াতলী গ্রামে পাঁচটি পুকুর ইজারা বরাদ্দ নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু দুদক অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে, চুমকি কারণ একজন গৃহিণী এবং তার স্বামী প্রদীপ কুমার দাশ ১৯৯৫ সালে পুলিশের উপ-পরিদর্শক হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। ২০০২ সালে তাদের ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা সঞ্চিত অর্থ ছিল না। ২০০২ সাল থেকে মাছের ব্যবসা থেকে আয় করার কথা বলা হলেও আয়কর রিটার্নে তিনি সেটা উল্লেখ করেননি। এতে দুদকের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে, মাছের ব্যবসা থেকে দেড় কোটি টাকা আয়ের বিষয়টি সঠিক নয়। চুমকি কারণ তার স্বামী প্রদীপের অপরাধলব্ধ অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের উদ্দেশ্যে ভুয়া মাছের ব্যবসা দেখিয়েছেন।