আমরা কবে মানুষ হব?

হেনা সুলতানা

বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালির বড় প্রিয় মানুষ, প্রিয় নেতা। বাঙালির শিকড় থেকে জেগে ওঠা এক বিদ্রোহী নেতা, বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের মহান নেতা। তাই তিনি আমাদের জাতির জনক। তাঁর জন্য আমরা গর্বিত। স্বাধীন জাতি হিসেবে সম্মানিত।

১৯৭৫-এর পনেরোই আগস্ট একদল দুর্বৃত্ত আমাদের মহান নেতাকে সপরিবারে হত্যা করে। বাংলাদেশ হারায় তার জাতির পিতাকে। এ নির্মম, কলঙ্কময় স্মৃতি আমরা কখনো ভুলব না। এ দিন আমাদের জাতীয় শোক দিবস। যথাযোগ্য মর্যাদায় দিনটি পালন উপলক্ষ্যে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়। শুধু এ দিনটিই নয়—বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন জাতীয় শিশু দিবস, সে দিবসটি পালন উপলক্ষ্যে থাকে তাত্পর্যময় নানা কর্মসূচি। এছাড়াও বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনকে ঘিরে উল্লেখ্যযোগ্য দিবসগুলি পালন করা হয় বিপুল উত্সাহ-উদ্দীপনা নিয়ে। দিবসগুলি পালন করবার প্রধান অনুষঙ্গ হচ্ছে প্রচার-প্রচারণায় বঙ্গবন্ধুর ছবিসহ ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুন, প্লাকার্ড ইত্যাদি। এসবের কল্যাণে শহর-বন্দর-গ্রাম-গঞ্জের রাস্তা-ঘাট, অলিগলি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্মুখভাগ সত্যিই বর্ণাঢ্য হয়ে ওঠে।

মাত্র ক‘দিন আগে আমরা পার করে এলাম জাতীয় শোক দিবস। এ সময়টা ঝড়-বাদলের। বৃষ্টিসহ মাঝারি বাতাসে জাতির পিতার ছবি সম্বলিত পোস্টার-ব্যানারগুলি কোথাও হেলে পড়ে আছে, কোথাও রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। দেখেছি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলির সামনেও ব্যানারগুলি কী অবহেলায় ঝুলছে।

এ দৃশ্য আমরা দেখতে পাই আমাদের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের গৌরবময় দিনগুলিতেও। একটি দেশের স্বাধীন সার্বভৌমত্বের প্রতীক হচ্ছে তার পতাকা আর এ পতাকা একটি দেশ তথা রাষ্ট্রের পরিচয় বহন করে। পরাধীনতার আবরণ থেকে বের হয়ে স্বাধীনতার সোনালি অক্ষরে নাম লেখানোর একটি অর্জন হচ্ছে সবুজের বুকে লাল পতাকাটি। তার মান অক্ষুণ্ন্ন রাখার দায়িত্ব দেশের মানুষেরই। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পতাকা উত্তোলিত রাখার নিয়ম। কিন্তু প্রায়ই নিজের ইচ্ছেমতো মাপে, রঙে বানিয়ে আখাম্বা একটা খুঁটিতে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে পতাকা। একবার পতাকা উঠল তো আর তা নামানোর নাম নেই। সকাল থেকে সন্ধ্যা, রাত পেরিয়ে আবার সকাল, পতাকা উড়ছে তো উড়ছেই। রোদ-ঝড়-বৃষ্টি, ধুলোয় রং জ্বলে ফ্যাকাসে হয়ে পচে নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত পতাকা সেই খঁটিতেই ঝুলতে থাকে অনেক সময়। খেয়ালও করছে না কেউ। এমনকি মোটরযান, রেলগাড়ি, নৌকার খোল, সম্মুখভাগ অথবা পিছনের অংশও ঢেকে রাখা হচ্ছে জাতীয় পতাকা দিয়ে। যা দেখে লজ্জায় মাথা নত হয়ে আসে। কিছু বলতে গেলে সে হয় অরণ্যে রোদন।

কিন্তু এ যে জাতীয় পতাকার অবমাননা, শহিদের রক্তের অপমান! কার দেখার দায়িত্ব? কে দেখছে এসব!

যদিও আইন রয়েছে জাতির পিতা, জাতীয় পতাকা অবমাননা প্রতিরোধে, আছে শাস্তির বিধান। এসব অবমাননাকর বিষয় দেখবার জন্য আদৌ কেউ কি আছেন? থাকলেও এই ধরনের আবেগ-অনুভূতির জায়গাগুলো দেখবার সময় কোথায় তাদের? দেশপ্রেম, নিজের অস্তিত্ব অর্জনের গৌরবগাথা ভুলে থাকার অভ্যাস আমাদের।

দেশে আইন আছে। সে আইন চলছে নিজস্ব গতিতে।

কিন্তু এভাবে চলতে পারে না। দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনকেই দায়িত্ব নিতে হবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচারের মাধ্যমে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের নিয়ম জানানো ও জাতির পিতার ছবির প্রতি সম্মান জানানোর বিষয়টি।

মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বঙ্গমাতা’ কবিতাটির শেষ দুটি লাইন—

‘সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,

রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি।’

n লেখক : শিক্ষক ও গল্পকার