সমগ্র দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত সোয়া লক্ষ শিক্ষক তাহাদের উচ্চতর ডিগ্রি সার্ভিসবুকে অন্তর্ভুক্ত করিতে পারিতেছেন না। ইহাতে তাহারা মনে চাপা ক্ষোভ ও দুঃখ লইয়া চাকুরি করিয়া যাইতেছেন। চাকুরিরত অবস্থায় তাহারা পড়াশুনা করিয়া এই ডিগ্রি লাভ করিয়াছেন; কিন্তু তাহা কোনো কাজে ব্যবহার করিতে পারিতেছেন না। ইহাতে বৃদ্ধি পাইতেছে না তাহাদের সামাজিক মর্যাদা। হইতেছেন পদোন্নতির সুযোগ হইতে বঞ্চিত। এই ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক যে জটিলতা সৃষ্টি হইয়াছে, তাহা দূর করা জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। প্রাথমিক শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিতরা আসিলে এই শিক্ষাব্যবস্থার গুণমান বৃদ্ধি পাইবে। কিন্তু যেইভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির মাধ্যমে ইহাকে নিরুত্সাহিত করা হইতেছে তাহা মোটেও কাম্য নহে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের নূতন নিয়োগবিধি-২০১৯ অনুযায়ী নারী-পুরুষনির্বিশেষে সকলের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হইয়াছে কমপক্ষে দ্বিতীয় শ্রেণির স্নাতক ডিগ্রি। এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত যৌক্তিক ও ইতিবাচক। ইহার পূর্বে বেশ কয়েক বত্সর ধরিয়া এই পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল নারীদের জন্য উচ্চমাধ্যমিক ও পুরুষদের জন্য স্নাতক পাশ। এই পদে আবার ৬০ শতাংশ শিক্ষকই নারী। এমন বহু সহকারী শিক্ষক রহিয়াছেন, যাহারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স-মাস্টার্স পড়িবার সময় উচ্চমাধ্যমিকের সার্টিফিকেট জমা দিয়া এই পদের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কেহ কেহ আবার চাকুরিরত থাকা অবস্থায় প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়া ডিগ্রি পাশ করেন। কিন্তু তাহাদের অনেকে তাহাদের উচ্চতর ডিগ্রির সার্টিফিকেট সার্ভিসবুকে অন্তর্ভুক্ত করিতে পারিতেছেন না। কারণ নিয়ম রহিয়াছে, এই ধরনের কোনো পরীক্ষায় অংশ লইতে হইলে শিক্ষা অফিসের অনুমতিপত্র লইতে হয়। কিন্তু অনেকে ঠিকমতো অনুমতিপত্র পান নাই। দেখা যায়, অনুমতিপত্র পাইতে বিলম্ব হইতেছে দেখিয়া কেহ যদি নৈমিত্তিক বা মেডিক্যাল ছুটি গ্রহণ করিয়া পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন এবং পাশ করেন, পরে পরীক্ষা শেষ হইয়া গিয়াছে—এমন অজুহাতে আর অনুমতিপত্র প্রদান করা হয় না। ইহাতে অনেকে বাধ্য হইয়া অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করিবার পরও আবার কোনো কলেজের ডিগ্রিতে ভর্তি হন। অনেক শিক্ষা অফিসে মোটা অঙ্কের লেনদেনের মাধ্যমে পূর্বানুমতি দেখাইয়া কিছু কিছু সনদ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এমন দুর্নীতির ক্ষেত্র তৈরির জন্যই মূলত এই ক্ষেত্রে হয়রানি চলে বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে।
অনেক সহকারী শিক্ষক, বিশেষত নারীরা স্কুল ও সংসার সামলাইয়া বহু কষ্টে অনার্স বা মাস্টার্স পাশ করিয়াছেন, তাহারা খাতা-কলমে কেন উচ্চমাধ্যমিক পাশ থাকিবেন? তাহাদের কেন জাতীয় বেতন স্কেলের ১৪তম হইতে ১৩তম গ্রেডে উন্নীত হইবার সুযোগ দেওয়া হইবে না? বিষয়টি খুবই অমানবিক ও মানসিকভাবে যন্ত্রণাদায়ক। এই জন্য এই সকল শিক্ষকের শিক্ষার সনদ সার্ভিসবুকে এন্ট্রি করিবার পথ সহজ করা প্রয়োজন। এই ব্যাপারে সময় নির্ধারণ করিয়া দিয়া একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা যাইতে পারে। পরাধীন ও স্বাধীন দেশের আমলাতন্ত্রের গতিপ্রকৃতি এক হইতে পারে না। এখন ডিজিটালাইজেশনের যুগ, তাই সকল কিছু অবশ্যই সহজীকরণ করিতে হইবে। নাগরিকদের ভোগান্তি বৃদ্ধি না করিয়া তাহা দ্রুত নিরসন করিতে হইবে। এই ক্ষেত্রে সুবিবেচনাপ্রসূত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হইবে বলিয়া আমরা আশা করি।