রবীন্দ্রনাথ ‘কল্পনা’ কাব্যে ‘মদনভস্মের পর’ কবিতায় লিখেছেন—‘পঞ্চশরে দগ্ধ করে করেছ একি সন্ন্যাসী/বিশ্বময় দিয়েছ তারে ছড়ায়ে।/ ব্যাকুলতর বেদনা তার বাতাসে উঠে নিশ্বাসী/অশ্রু তার আকাশে পড়ে গড়ায়ে।...’ এই কবিতায় জানা গেল মদন দেব যার উপর শর নিক্ষেপ করতেন, সে-ই শুধু যৌবনপ্রাপ্ত হতো—অন্য কেউ নয়। মদনভস্মের পরে দেখা যাচ্ছে মদন পঞ্চশরকে দগ্ধ বা ভস্ম করে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়েছেন। এরপর থেকে তাবত্ প্রাণীকুল যথাসময়ে যৌবনপ্রাপ্ত হচ্ছে।
বর্তমানে আরেকটি পদার্থ প্রাণী না হয়েও যৌবনপ্রাপ্ত হচ্ছে অহরহ! মানুষ এবং বাতাস তার বাহন। যেখানে সেখানে যখন তখন উড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সাগরে, পর্বতে—মাটিতে তো বটেই। পদার্থটি হলো পলিথিন বা এর তৈরি বিবিধ সামগ্রী। ‘আসমুদ্র হিমাচল’ কোথাও যেতে এর বাধা নেই। দেখলাম ভারতের হিমাচল প্রদেশের কুলু মানালী, সিলঙ্গভেলি, মাল রোড, ব্যস নদী—নদীতীর কমবেশি সর্বত্র এর অবাধ বিচরণ। আগ্রা, দিল্লি কেউ এই অভিশাপ থেকে মুক্ত নয়। তবে আমাদের থেকে কম—এই যা পার্থক্য।
আমাদের ডাস্টবিন থাকা সত্ত্বেও সেটি দেখেও না দেখে ব্যবহার করি না। একবার জাহাজ ভ্রমণে গিয়েছিলাম চাঁদপুর। দেখলাম জাহাজে ময়লা-আর্বজনা ফেলার ভালো ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষিত সহযাত্রীরা দেদারসে ওয়ানটাইম ইউজ প্লেট, কফি কাপ আরো কত কী নদীতে ছুড়ে ছুড়ে ফেলছেন। কেন ফেলছেন?— প্রশ্ন করলে সামান্য মুচকি হাসি ছাড়া কোনো সদুত্তর পাইনি। মনে হলো আমাকেই যেন ব্যঙ্গ করলেন তাঁরা!
কতবার কত পদক্ষেপ—কত কঠোর শাস্তি, কত জরিমানা—কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। হবে কেন? মানুষরূপী মদন আছে না? বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়ে মহা শান্তিতে বসে আছে। কিন্তু এভাবে আর কত?
আজ আবার নতুন করে কেন ভাবি না—এত যে মরণঘাতী ব্যাধি, জীবন হরণকারী ভাইরাস—কোথা থেকে কিভাবে আসছে? কার সঙ্গে কার বিক্রিয়ায় তৈরি হচ্ছে এরা? আমাদেরই অসচেতনতায় আমাদের মারতে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে। যা প্রতিহত করার ক্ষমতা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে অসহায় হচ্ছি প্রতিদিন প্রতিক্ষণ!
ড. গুলশান আরা, তেজগাঁও, ঢাকা