আদালতে নারী পাচারকারী প্রতীক খন্দকারের জবানবন্দি

তরুণীদের মালয়েশিয়ার কথা বলে নিয়ে যাওয়া হতো ভারতে

ভালো চাকরির লোভ দেখিয়ে টাকা ছাড়াই তরুণীদের মালয়েশিয়ার কথা বলে নেওয়া হতো ভারতে। পরে তাদের বিক্রি করে দেওয়া হতো ভারতের বিভিন্ন নিষিদ্ধপল্লিতে। বিভিন্ন কৌশলে তরুণীদের সংগ্রহ করা হতো রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে। পাচারকারী চক্রের মহিলা সদস্যদের কাউকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে বাসা ভাড়া (সাবলেট) নেওয়া হতো। এরপর সুযোগ বুঝে টার্গেট তরুণীদের স্বজনদের বোঝানো হতো মালয়েশিয়ায় ভালো চাকরির সুযোগ আছে।

গতকাল মঙ্গলবার আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব তথ্য জানিয়েছে নারী পাচারকারী চক্রের হোতা মহেমুনুজ্জামান ওরফে প্রতীক খন্দকার ওরফে বাবু। জবানবন্দি শেষে আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডি পরিদর্শক মো. জাকির হোসেন।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ রেজাউল হায়দার বলেন, প্রতীক খন্দকার নারী পাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা। তার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের মাস্টারপাড়ায়। এক সময় সে মালয়েশিয়ায় ছিল। বছর দুয়েক আগে দেশের ফিরে নারী পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। সর্বশেষ সে তার নারী সহযোগী জেরিনকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে রাজধানীর সবুজবাগের একটি ফ্ল্যাটে সাবলেট হিসেবে ভাড়া নেয়। পরে ঐ ফ্ল্যাটে থাকা এক তরুণীকে ভালো চাকরি দিয়ে মালয়েশিয়া পাঠাবেন বলে প্ররোচিত করেন তারা। গত বছর ২৩ নভেম্বর ঐ তরুণীকে মানব পাচারকারী চক্রের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে বেনাপোল সীমান্তের একটি বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে ভুক্তভোগী ঐ নারীকে আটকে রেখে ধর্ষণ করা হয়। এরপর ভুক্তভোগীকে ভারতে একটি দালাল চক্রের কাছে বিক্রির উদ্দেশ্যে পাচার করার সময় বেনাপোল থানা পুলিশ তরুণীকে উদ্ধার এবং চক্রের এক সদস্যকে গ্রেফতার করে। তবে এ সময় পালিয়ে যায় প্রতীক। এ ঘটনায় সবুজবাগ থানায় ভুক্তভোগী ঐ তরুণীর পরিবারের করা মামলায় প্রতীকের কথিত স্ত্রী জান্নাতুল ওরফে জেরিনকে পুলিশ গ্রেফতার করে।  পরবর্তীতে পুলিশ সদর দফতরের নির্দেশে টানা প্রায় ১০ মাস অনুসন্ধানের পর দুই দিন আগে প্রতীককে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পরিদর্শক মো. জাকির হোসেন বলেন, প্রতীকের কথিত স্ত্রী জেরিনের বাসা রাজধানীর জুরাইন এলাকায়। থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। বর্তমানে সে কারাগারে রয়েছে। মামলাটি সিআইডি তদন্ত শুরুর পর গ্রেফতার করা হয় প্রতীকের দুই সহযোগীকে। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তিনি বলেন, প্রতীক খন্দকারের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পর্ণোগ্রাফি আইনে পৃথক দুটি মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

ডিআইজি শেখ রেজাউল হায়দার বলেন, এর আগেও আসামিরা বিভিন্ন নারীকে সৌদি আরব পাঠানোর কথা বলে ভারতে পাচার করেন এবং অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করেন। এ বিষয়ে তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

সিআইডির এ কর্মকর্তা আরো জানান, গ্রেফতারকৃতরা  চাকরি দেওয়ার নামে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে প্রলুব্ধ করলেও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে কোনো টাকা নিত না। প্রথম থেকে শুরু করে ভারতে তাদের বিক্রির আগ পর্যন্ত খুব ভালো ব্যবহার করতো। এরপর ভারতে পাচারের পর তাদের অসামাজিক কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করতো চক্রটি। এসব নারীকে বিক্রি করে অর্থ হাতিয়ে নিতেন প্রতীক ও কথিত স্ত্রী জেরিন। তিনি বলেন, এ চক্রের অপর সদস্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তাদের গ্রেফতার করা গেলে নারী পাচারের আরো তথ্য জানা যাবে।