ভূমধ্যসাগরে উত্তেজনা :প্রসঙ্গ তুরস্ক

মো. হযরত আলী

আগামীর বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম হটস্পট ভূমধ্যসাগর! যদিও কয়েক বছর ধরেই মাঠ তৈরি হচ্ছে। গত ৬ আগস্ট গ্রিস ও মিশর ভূমধ্য সমুদ্র নিয়ে মেরিটাইন চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির আওতায় মিশর ও গ্রিস পরস্পর তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ ও উত্তোলন করবে। পাশাপাশি সমুদ্র সীমানাও নিজেরা ঠিক করে নেয়। কিন্তু এতে তুরস্কের ও লিবিয়ার সমুদ্র সীমানা নিজেদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছে গ্রিস ও মিশর। এই চুক্তিতে গ্রিস মিশরকে যে এরিয়া দিয়েছে, তার আয়তন মিশর লিবিয়ার সঙ্গে চুক্তি করলে যে আয়তন পেত তার চেয়ে কম। অর্থাত্ গ্রিসের সঙ্গে যুক্তি করে মিশরের সমুদ্র সীমানা কমেছে। ১ম ম্যাপে গ্রিস বিশাল একটা এরিয়া নিজেদের করে নিয়েছে। এতে তুরস্কের ভাগে কিছুই রাখেনি। ২য় ম্যাপ, এটা তুরস্কের দাবিকৃত এবং এই অনুযায়ী তুরস্ক ও লিবিয়া চুক্তি করেছে। এতে কিন্তু মিশরের সমুদ্রসীমা কমেনি, বরং বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু তার পরেও মিশর গ্রিসের সঙ্গেই চুক্তি করেছে। মূলত, গত বছরের নভেম্ব্বরে লিবিয়ার সঙ্গে তুরস্কের যে চুক্তি হয়েছিল তার পালটা পদক্ষেপ হিসেবেই এই চুক্তি। তারা কোনোভাবেই মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্কের শক্তিশালী অবস্থান চায় না। গ্রিস ও মিশরের এই চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্দেশ্য হলো—পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের তত্পরতা কমিয়ে আনা। এতে পূর্ব ভূমধ্যসাগর অনেকটা উত্তপ্ত ময়দানে পরিণত হয়েছে।

ইতিমধ্যেই পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মিশর এবং সাইপ্রাস বড় জ্বালানি খনির সন্ধান পেয়েছে। এরপর তুরস্ক ঐ এলাকায় প্রাকৃতিক সম্পদের খোঁজ পাওয়ার জন্য অতিমাত্রায় তত্পর হয়ে উঠেছে।

পাশাপাশি গ্রিস এবং মিশরের নতুন এই চুক্তিকে পুরোপুরি অবৈধ বলছে তুরস্ক। পালটা পদক্ষেপ হিসেবে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের অনুরোধে কিছুদিন আগে ঐ এলাকায় অনুসন্ধান কাজ স্থগিত রাখা তুরস্ক এই চুক্তি সংগঠিত হওয়ার পর সাময়িক বিরতির পর সম্প্রতি আবার নতুন করে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নেমেছে। পাশাপাশি এ কাজের জন্য পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্ক তাদের জারি করা ‘সার্ভে অ্যালার্ট’-এর অংশ হিসেবে গ্রিসের কাস্টেলপারিসো দ্বীপের কাছে ‘ওরুচ রেইচ’ নামে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী জাহাজ পাঠিয়েছে এবং গত সপ্তাহে গ্রিসের দুইটি দ্বীপ ঘেঁষে নৌমহড়া চালিয়েছে। তুরস্ক গ্রিসের দুইটি দ্বীপের কাছে দুই দিনব্যাপী নৌমহড়া চালিয়ে মূলত এ সিগন্যাল দিয়েছে যে, মিশরের সঙ্গে গ্রিস যে চুক্তি করেছে আঙ্কারা তা মানবে না।

তুরস্কের টার্গেট মূলত এখানে চারটি : ১. ভূমধ্যসাগরে নিজের জলসীমায় অবস্থিত বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের সার্বভৌমত্ব অর্জন করা যা এখনো সমাধানকৃত কোনো ইস্যু নয়! ২. লুজান চুক্তির মাধ্যমে বেশ কিছু দ্বীপ গ্রিস নিয়েছে যা মূলত তুরস্কের পাওয়ার কথা, ওগুলোকে ফিরিয়ে আনা। ৩. সাইপ্রাসে সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখা। ৪. এই অঞ্চলের (মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকা) রাজনীতিতে স্থায়ীভাবে বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া যাতে আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো ইস্যুতে বড় ভূমিকা পালন করা যায়, বিশেষত ফিলিস্তিন ইস্যু!

তুরস্কের এই অভিযাত্রা মোটেও সহজ হবে না। তাদের এই অভিযাত্রায় মূল প্রতিপক্ষ গ্রিস, ইসরাইল, ফ্রান্স। ইতিমধ্যেই গ্রিস তার প্রতিক্রিয়া শুরু করেছে। সম্প্রতি গ্রিস আজিয়ান সাগরের রোডস দ্বীপ থেকে বেসামরিক লোকদের বহনকারী একটি তুর্কি নৌযানে গুলি চালিয়েছে।

তুরস্কের মুগলা প্রদেশ থেকে ৭.২ নটিক্যাল মাইল দূরে গ্রিক জলসীমায় আক্রমণ করা হয়। ফ্রান্সও যুক্ত হয়েছে গ্রিসের সঙ্গে। বিতর্কিত পানিসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকে কেন্দ্র করে গ্রিস ও তুরস্কের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফ্রান্স। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী মন্ত্রণালয় সম্প্রতি (১৩ আগস্ট) জানিয়েছে, ফ্রান্স তার সেনা উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দুইটি রাফায়েল যুদ্ধবিমান ও নৌবাহিনী ফ্রিগেট ‘লাফায়েট’ ঐ অঞ্চলে প্রেরণ করবে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাত্রেঁদ্ধাও স্বয়ং গত বুধবার এক টুইট বার্তায় এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

এরপরের সিরিয়ালে মিশর, সৌদি-আমিরাত গং। আর ওপরে ওপরে যাই বলুক ভেতরে ভেতরে আমেরিকা, জার্মানি, রাশিয়াসহ প্রায় সব পরাশক্তি। ১৯২৩ সালে ঐতিহাসিক লুজান চুক্তির মেয়াদ আছে কি নেই, সেই বিতর্ক রয়েছে। সাধারণত আন্তর্জাতিক চুক্তি ১০০ বছর পর অটোমেটিক বাতিল বলে গণ্য হয়। তবে পশ্চিমাদের মতে, এই চুক্তি সারাজীবনের জন্য। তবে, তুর্কি যে স্পষ্টভাবে লুজান চুক্তির অনেকগুলো বিষয় লঙ্ঘন করতে চায় কিংবা ছুড়ে ফেলে দিতে চায় তা খুবই স্পষ্ট।

এই ধরনের বিশাল চ্যালেঞ্জ নিয়ে সামনে আগানো অনেক বড় সাহসের কাজ। আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরের পর এমনিতেই চাপে রয়েছে তুরস্ক সরকার। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জতো রয়েছেই। তবে বর্তমান পরিস্থিতি গত হওয়া সব সমস্যার চেয়ে বেশ কঠিন। তবে যেহেতু এরদোগানের মতো ক্যারিশমাটিক নেতা রয়েছেন। দেখা যাক, এতসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্যে পরাশক্তির আসনে আসীন হতে পারে কি না। নাকি আবারও ইউরোপের রুগ্ণ দেশে পরিণত হবে!

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়