মুমতা হেনা মীম
বর্তমানের এই সময়ে পৃথিবীর অর্থনীতি-রাজনীতি-সংস্কৃতি সব প্রায় থমকে গেছে। প্রত্যেকটা দেশই অর্থনৈতিকভাবে প্রায় ধ্বংসের দোরগোড়ায়। অনেকে ভাবছে এক সময় এই মহামারির প্রকোপ কমে আসবে, কলকারখানা, শিল্প বাণিজ্যকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিনোদনকেন্দ্রগুলো আগের মতো খুলে যাবে।
ঘুরতে শুরু করবে অর্থনীতির চাকা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান সময়ে যে ক্ষতি হচ্ছে, আদৌ কি তা এত দ্রুত পূরণ করা সম্ভব? এ বছরের মার্চ থেকে যে আর্থিক সংকটের শুরু হয়েছে, সেটা ১৯৩০ সালের বৈশ্বিক মহামন্দাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। এর আগের অর্থনৈতিক সংকটগুলোতে ক্রেডিট মার্কেটগুলো প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, বেকারত্ব বেড়ে ছিল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দেউলিয়া হতে শুরু করেছিল। সে সংকটের সৃষ্টি ছিল দীর্ঘকালীন। কিন্তু ইতিহাসে এই প্রথম এমন এক সংকটের শুরু হলো, যা মাত্র তিন-চার সপ্তাহেই সব স্থবির করে দিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে মধ্যম হারের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, পরিব্যাপ্ত দারিদ্র্য, আয় বণ্টনে সমতার অভাব, শ্রমশক্তির উল্লেখযোগ্য বেকারত্ব, জ্বালানি, খাদ্যশস্য এবং মূলধনি যন্ত্রপাতির জন্য আমদানিনির্ভরতা, জাতীয় সঞ্চয়ের নিম্নহার, বৈদেশিক সাহায্যের ওপর ক্রমহ্রাসমান নির্ভরতা এবং কৃষি খাতের সংকোচনের সঙ্গে সঙ্গে সেবা খাতের দ্রুত প্রবৃদ্ধি। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জন করছিল। হঠাত্ এ করোনায় গোটা বিশ্ব জুড়ে অর্থনৈতিক স্থবিরতার সৃষ্টি হলো, আমাদের দেশেও পড়েছে বিরূপ প্রভাব। এরই মধ্যে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। আবার অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে। এতে বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতি সংকুচিত হচ্ছে। এতে ভয়ংকর এক অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি দিনে দিনে বাড়ছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স কমে গেছে, যারা বিদেশে গেছেন তাদের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে, অনেকে ফিরে এসেছে দেশে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। আইএমএফ এক প্রতিবেদনে করোনাপূর্ব সময়ে চলতি অর্থবছরের জন্য ৭.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল, অর্থাত্ করোনার প্রভাবে প্রবৃদ্ধি কমে যাবে ৩.৬ শতাংশ। এ প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়, করোনার কারণে আমদানি এবং রপ্তানিতে ধস নামবে। ফলে রপ্তানি খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হবে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের দেশে হতদরিদ্রের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যাবে। পথে বসবে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। তবে করোনা ভাইরাস মহামারির মধ্যেই একটু একটু করে আশার আলো দেখাচ্ছে দেশের শেয়ারবাজার। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, গত কয়েক সপ্তাহে অব্যাহত পতন থেকে বেরিয়ে আসার চিত্র দেখে অনেকের মধ্যে আস্থা ফিরতে শুরু করেছে।
অর্থনৈতিক স্থবিরতা থেকে উত্তরণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্বল্প পরিসরে শিল্পকারখানাগুলো সচল রাখা যেতে পারে, বেসরকারি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যেন কর্মী ছাঁটাই না হয় এবং প্রতিষ্ঠানগুলো যেন বন্ধ না হয়ে যায় সে ব্যাপারে লক্ষ্য রাখতে হবে। এছাড়া অর্থনৈতিক বিভিন্ন খাতে ঘোষিত প্রণোদনা ও ভর্তুকির সুষম বণ্টন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটানো যেতে পারে।
n লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়