হজরত শেখ অছিয়র রহমান আল্ ফারুকী (রহ)

 

চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী থানার চরণদ্বীপ গ্রামে ১২৫৯ বাংলা, ৭ মাঘ, ১৮৫২ ইং ২১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন ইসলামি রেনেসাঁসের প্রণেতা বেলায়েতে মোতলাকা যুগ সংস্কারক হজরত গাউসুল আজম মাওলানা শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.)। তার প্রধান ও প্রথম খলিফা কুতুবুল আকতাব হজরত মাওলানা শাহসুফি শেখ অছিয়র রহমান আল ফারুকী (ক.), যাকে শিষ্যত্বের উপাধিরূপে ‘মাওলানা আকদছ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। জাহের ও বাতেন—এ দুই ধরনের যথার্থ জ্ঞান অর্জনের যে দীর্ঘ পথ পরিক্রমা, ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং সাধনা, মাওলানা আকদছের জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেই তার অপূর্ব প্রতিফলন দেখা যায়।

১২৮৫ হিজরি সনে চট্টগ্রামে সরকারি মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ, উচ্চশিক্ষার্থে ১২৮৯ হিজরি সনে রাজশাহী সরকারি মাদ্রাসায় জামায়াতে উলায় ভর্তি এবং ১২৯০ হিজরি সনে কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে জামায়াতুল উলার শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মাওলানা আকদছকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিশেষ মর্যাদার আসনে অভিষিক্ত করে। ১২৯৫ হিজরি সনে একই মাদ্রাসা থেকে হাদিস, তাফসির, কালাম, ফেকাহ ইত্যাদি বিষয়ে সমধিক জ্ঞান অর্জন করে মাওলানা আকদছ মাদ্রাসা শিক্ষার শীর্ষ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১২৯৬ হিজরি সনে আলিগড় জামেউল উলুম মাদ্রাসায় দুই বত্সরকাল অধ্যাপনার কাজে নিয়োজিত থেকে নিজেকে এলমে বাতেন, খেলাফত ও কামালিয়ত অর্জনে এমন যোগ্যতর স্থানে নিয়ে যান, সে সময়কালে তথা ১২৯৮ হিজরি সনে আমাদের প্রিয় নবি রসুলে করিম (দ) কর্তৃক স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে চট্টগ্রাম জেলার মাইজভাণ্ডার গ্রামে হজরত গাউসুল আজম মাওলানা শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর চরণে নিজেকে পেশ করার জন্য স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন।

হজরত গাউসুল আজম মাওলানা শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.) কর্তৃক স্বপ্নযোগে দর্শনদান এবং ‘আমি তোমার অপেক্ষায় আছি, আমার জ্যোতির্ময় প্রদীপের সাথে মিশে একাত্ম হয়ে যাও’ নির্দেশপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই মাইজভান্ডার দরবার শরিফে হাজির হয়ে বেলায়েতে মোতলাকায়ে আহমদি যুগের সূচনাকারী হজরত গাউসুল আজম মাওলানা শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর নৈকট্যে এসে তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ১৩০০ হিজরি সনে তার দ্বারা একখানা চাদর আপাদমস্তক পরিহিত হয়ে প্রথম খলিফার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনিই প্রথম খলিফা, যিনি গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারীর এত্তেহাদি ফয়েজপ্রাপ্ত এবং হজরত বাবাজান কেবলার ফয়েজপ্রাপ্তির পূর্বেই খেলাফতপ্রাপ্ত হয়ে নিজ বাড়িতে সাজ্জাদানশীন হওয়ার হুকুমপ্রাপ্ত হন। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, হজরত গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.) মাওলানা আকদছকে ‘সন্তান’ বলে সম্বোধন করতেন। একসময় মাওলানা আকদছের বড় ভাই তার কঠোর রেয়াজতের মাত্রা সহজ করার নিমিত্তে হজরত গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর দরবারে আবেদন পেশ করলে হজরত আকদছ (ক.) মাওলানা আকদছ তথা হজরত শেখ অছিয়র রহমান আল ফারুকীর জন্য চিন্তা না করার পরামর্শ দেন এবং ‘শারাবের পাত্রশুদ্ধ খেতে চায়’ বয়ানের মাধ্যমে মাওলানা আকদছের আধ্যাত্মিকতার গভীরতা সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

মাওলানা আকদছ তার জীবদ্দশায় এবং পরবর্তী সময়ে বহু রুহানি শক্তির প্রকাশ ঘটিয়ে কারামতের বিভিন্ন প্রকৃতি ও মাত্রার অনবদ্য স্বরূপ উদ্ঘাটন করেন। শুধু চরণদ্বীপ বা চট্টগ্রাম নয়, বিশ্ববাসীর কল্যাণে এবং মাইজভাণ্ডারী দর্শনের অনুসরণে বিশ্বমানবতার মুক্তির এক অপূর্ব উদাহরণ হিসেবে যুগ যুগ ধরে দল-মত-ধর্মনির্বিশেষে সব মানবগোষ্ঠীর কাছে এক আশীর্বাদের ভাণ্ডার হয়ে থাকবেন। আজকের এই দিনে তার চরণ যুগলে অজস্র সালাম ও শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

lলেখক :প্রাক্তন উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়