শহীদ কাদরীর সঙ্গে দেখা হলো না

কক্সবাজার থেকে হিমছড়ি যাওয়ার পথেই একটি স্পটের নাম দরিয়ানগর। হয়তো দরিয়ানগর জায়গাটার আদি নাম নয়, এ নাম দিয়েছেন কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। এই কবির জন্মদিন উপলক্ষে আমরা ঢাকা থেকে গেছিলাম প্রায় পঞ্চাশ জনের একটি দল। সেখানে পাহাড়ের ঢালে একটি মাচাং করা স্টেজে গান-কবিতা চলছিল। দুইশো ফুট দূরেই সমুদ্র। আমি গান-কবিতার আদিখ্যেতা ছেড়ে সমুদ্রের দিকে হাঁটতে থাকি। দেখি, এক অচেনা মানবী। কবি ও সম্পাদক আবুল হাসনাত পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘ইনি নাজমুন নেসা পিয়ারি, জার্মানিতে থাকেন।’ বললাম, আমার তো শহীদ কাদরীর সঙ্গে দেখা হলো না! মানবী হাসলেন, বললেন, ‘উনি তো যুক্তরাষ্ট্রে।’ জানি। সুমন চট্টোপাধ্যায়ের কথাও জানি কিছু। পিয়ারি বললেন, ‘এখন তো তিনি কোলকাতায়।’ বললাম, হুম, কবীর সুমন কলকাতায়। তারপরও আমি বলি, ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা।’ পিয়ারি ছুটে এলেন, আমিও ছুটে গেলাম। সমুদ্র সাক্ষী রইল একটি অসম বয়সের ‘হাগ’-এর। কিন্তু শহীদ কাদরী যে গত শতকের লেইট ফিফটিজে আগত এক ভীষণ তরুণ কবি, তা তো আমাদের জানাই ছিল। ঢাকার পুরানা পল্টন, পুরোনো ঢাকার বিউটি বোর্ডিং, রেকস থেকেই জানি। তারও আগে কাদরীদের ফ্যামিলি ছিল নগর কোলকাতায়। দেশভাগজনিত বাস্তবতায় তাঁরা চলে এসেছিলেন পূর্ববঙ্গের ঢাকায়। এসব কিছুই আমাদের মুখস্থ ছিল, যখন আমি বড়ো হচ্ছিলাম ঝিনাইদহে, আমার বড়ো হয়ে ওঠার ছোট্ট শহরে। কারণ, বাংলা কবিতা। তাই আমাদের জানা ছিল, প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিকই, কিন্তু শান্তি আমরা পাব না।

কবি শামসুর রাহমানের কাছে শুনেছি কাদরীর কথা। শামসুর রাহমানের একটি বইয়ের উত্সর্গপত্রে দেখেছিলাম, ‘আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দীন ও শহীদ কাদরী—আমাদের কাব্যহিংসা অমর হোক।’ সৈয়দ শামসুল হক, তাঁদের আরেক বন্ধু। হক ভাইয়ের কাছে শুনেছি কাদরীর কথা। চলে যাওয়ার আগে হক ভাই প্রায়ই বলতেন, ‘কাদরীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়।’ পোর্ট্রেট আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন কাদরীর আমেরিকার জীবনের ওপর আলোকপাত করে বিস্তারিত লিখেছেন, সেই লেখা ছাপা হয়েছিল ‘খোলা জানালা’য়। ‘খোলা জানালা’ ছিল একটি সাহিত্য সাময়িকী, যেখানে আমি চাকরি করতাম। আমার বা আমাদের প্রজন্মের প্রায় কেউই কাদরীকে স্বচক্ষে দেখিনি কখনো। কারণ, আমরা যখন বড়ো হয়ে উঠছিলাম, শহীদ কাদরী তার অনেক আগেই বাংলাদেশ ছেড়ে বিদেশে চলে গেছেন। বেঁচে থাকতে আর ফেরেননি। কিন্তু শহীদ কাদরীর কবিতা আমাদের কাছে তখনো ছিল, এখনো আছে, থেকেও যাবে। বাংলা কবিতায় শহীদ কাদরী একটি অবিনশ্বর নাম হয়ে থেকে যাচ্ছে।

হয়তো কবিদের রাজনীতিই কাদরীকে ঢাকায় থাকতে দেয়নি। দেশভাগ কাদরীদের পরিবারকে কোলকাতায় থাকতে দেয়নি। জার্মানি বা আমেরিকায় ছিলেন কাদরী। প্রয়াণের পর তাঁর শবদেহ ঢাকায় এল, ২০১৬ সালে। আমার দুর্ভাগ্য, কাদরীর মরদেহ যেদিন ঢাকায় আনা হলো, এর দু-তিন দিন আগে আমি আমার সিনেমার কাজে কোলকাতায় চলে গিয়েছিলাম। ফলত, কাদরীর সঙ্গে আর দেখাই হলো না। অবশ্য মরদেহ দেখার প্রতি কোনো ইচ্ছা আমার তীব্র নয় কখনোই।

একবার নিউ ইয়র্ক থেকে ঢাকায় এলেন লেখক আদনান সৈয়দ। তাঁর সঙ্গে আমার আগে আলাপ ছিল না। তিনি ফোনে জানতে চাইলেন, ‘আপনি কোথায় আছেন?’ আদনান সৈয়দের সঙ্গে দেখা হলো কাটাবন কনকর্ড মার্কেটে। তিনি কিছু কবিতার বই কিনেছেন, নিউ ইয়র্ক চলে যাবেন। আমার কবিতার বইও আছে তাঁর হাতে। তিনি বললেন, ‘শহীদ কাদরীর নামে অটোগ্রাফ দেন।’ ‘কেন? কারণ, শহীদ কাদরীই লিস্ট করে তাঁকে বলে দিয়েছেন, এদের বই কিনে অটোগ্রাফ সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে হবে। সেদিন লজ্জা পাচ্ছিলাম, গোপনে আনন্দও পেয়েছি।

গত বইমেলায় আমার দুটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়। একটি প্রথমা থেকে, ‘বুদবুদ পর্যায়ের কবিতা’। অন্যটি ‘কাপ্তেন, গভীর সমুদ্রে চলো’। ‘কাপ্তেন, গভীর সমুদ্রে চলো’ গ্রন্থের একটি কবিতা ‘শহীদ কাদরীর সঙ্গে একবার দেখা’। সেই কবিতার পাশে তরুণ শিল্পী সাদিক আহমেদ রেখাচিত্রে শহীদ কাদরীর একটি পোর্ট্রেট করে দেন, যেটি গ্রন্থে ছাপাও হয়েছে। খুব সুন্দর কাজ। কাদরীকে নিয়ে লেখার আছে অনেক, কাদরীর কবিতা বারবার পাঠ করার আছে। শহীদ কাদরীকে আমাদের মনে রাখার আছে চিরদিন, আমরা যারা বাংলা কবিতা ভালোবাসি, কবিতার সঙ্গে সংসার করি...