দেশের শতভাগ মানুষকে ২০২১ সালের মধ্যে বিদ্যুত্ দেওয়া হইবে। প্রধানমন্ত্রী গতকাল বৃহস্পতিবারও ইহা নূতন করিয়া জানাইয়াছেন। ঘরে ঘরে বিদ্যুত্ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ৮০টি পল্লী বিদ্যুত্ সমিতির মাধ্যমে দেশের ৪৬১টি উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়নের কর্মসূচি গ্রহণ করা হইয়াছে। বর্তমানে আরইবির প্রায় ৩ কোটি গ্রাহকের বিদ্যুত্সংযোগ ও সেবা নিশ্চিত করিতে পল্লী বিদ্যুতের বিভিন্ন টিম কাজ করিতেছে বলিয়া জানা গিয়াছে। ইতিপূর্বে আমরা দেখিয়াছি ‘আলোর ফেরিওয়ালা’র মাধ্যমে ঘুরিয়া ঘুরিয়া মানুষের বাড়ি বাড়ি বিদ্যুত্সংযোগ প্রদান করিতেছে আরইবি। এই কাজে সেবা দিতেছে ৮০০ পিকআপ ও ভ্যানগাড়ি। গ্রাহক বিদ্যুত্সংযোগ লইতে চাহিলে মাত্র পাঁচ মিনিটেই পাওয়া যায় বিদ্যুতের সংযোগ। কোনো হয়রানি নাই, দিতে হইতেছে না কোনো বাড়তি অর্থও। সংবাদপত্রে এই সংক্রান্ত খবর আমরা বিভিন্ন সময় দেখিয়াছি।
তবে প্রদীপের তলায় অন্ধকারের মতো ‘ঘরে ঘরে আলো’র ক্ষেত্রেও অনেকে ছোপ ছোপ অন্ধকার দেখিতে পাইয়াছেন। পত্রপত্রিকাতেও বিভিন্ন সময় ছাপা হইয়াছে যে, সাধারণ গ্রাহক দূরের কথা, আরইবি প্রতিষ্ঠানটি দেশের প্রধান চালিকাশক্তি শিল্প-কলকারখানাতেও ঠিকমতো বিদ্যুত্ দিতে পারিতেছে না। উপরন্তু বিদ্যুতের ট্রিপ তো লাগিয়াই আছে। ইহা করোনা মহামারি শুরু হইবার পূর্বের চিত্র। অর্থাত্ স্বাভাবিক সময়েই বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ না পাইয়া বন্ধ হইয়া গিয়াছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ঋণের বোঝা মাথায় লইয়া উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করিতে পারিতেছে না। আরো অভিযোগ আছে যে, বত্সরের পর বত্সর সঞ্চালন-বিতরণ লাইন নষ্ট থাকিলেও আরইবি সেইগুলি মেরামত করিতে খুব বেশি তত্পরতা দেখায় না। অনেকেরই অভিযোগ, এই প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য শুধু নূতন সংযোগের দিকে লক্ষ্যপূরণে। উপজেলাগুলিতে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা বিদ্যুত্ থাকিতেছে না। কোথাও শুধু বিদ্যুতের খুঁটি গাড়িয়া শতভাগ সংযোগের বাহবা নেওয়া হইয়াছে।
আমরা মনে করি, বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুত্ পৌঁছাইয়া দেওয়ার কর্মসূচি যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের কাজ। কারণ, কেবল বিদ্যুতের লাইন থাকিলেই হয় না, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ও থাকা চাই। প্রতিবেশী বৃহত্ দেশ ভারতের ১৮ হাজার গ্রাম এখনো বিদ্যুতের অভাবে অন্ধকারে ডুবিয়া থাকে। এই তথ্য দেশটির সরকারি পিএমইন্ডিয়া ওয়েবসাইটেই দেওয়া আছে। যদিও ভারতে মোট গ্রামের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ লক্ষ। প্রকৃতপক্ষে, বিদ্যুত্-ব্যবস্থা একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক, যাহা বিদ্যুত্ উত্পাদন, সঞ্চালন ও সরবরাহ সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ও উপকরণকে সংযুক্ত করিয়া থাকে। এই নেটওয়ার্কে বিদ্যুত্সংযোগ একটি অংশ মাত্র। বিদ্যুত্ সঞ্চালন ও সরবরাহের আধুনিকয়ানে নজর না দিয়া কেবল শতভাগ বিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ‘সংযোগ’-এর দিকটি সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিলে তাহা সমগ্র ব্যবস্থার ভারসাম্যকে নষ্ট করিবে। আর ৩১টি উপজেলায় বিদ্যুত্ পৌঁছাইয়া দিলেই শতভাগ এলাকা বিদ্যুতের আওতায় আসিবে বটে। নিঃসন্দেহে ইহা মহতী উদ্যোগ। সরকার ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার প্রকল্প হাতে লইয়াছে, যেইখানে বিদ্যুত্ একটি প্রধান অনুষঙ্গ। সেইখানেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা না করিলে শতভাগ বিদ্যুতের বিষয়টি পরিহাসে পরিণত হইতে পারে।