৭ মাস বেতন না পেয়ে পাবনা চিনিকল শ্রমিকদের মানবেতর জীবন

প্রায় সাত মাস ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না পাবনা চিনিকলের ৬৭৯ জন শ্রমিক-কর্মচারী। করোনাকালে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীরা। শ্রমিক-কর্মচারীরা পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য বার বার বিক্ষোভ সমাবেশ করলেও কর্তৃপক্ষ কর্ণপাত করছেন না।

সর্বশেষ  গত ২৬ আগস্ট বুধবার বিকেলেও মিলগেটে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত করেছে শ্রমিক-কর্মচারীরা। শত শত শ্রমিক বেতন প্রদানের এক দফা দাবিতে তুলে স্লোগান দিয়ে ২ ঘণ্টা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে। এসময় সাত দিনের মধ্যে বেতন প্রদান না করা হলে বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে আল্টিমেটামও দেয়া হয়। এরপরও কর্তৃপক্ষ বেতন-ভাতা দিতে পারবেন কিনা এবিষয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

বর্তমানে চিনিকলটির শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-ভাতার পরিমাণ প্রায় ৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। পরিবার-পরিজন ও স্বজন নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা। আখচাষী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনসার আলী ডিলু জানান, আখের দাম বাবদ আখচাষীদের পাওনা ২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। আখচাষীরাও টাকা পেতে বারংবার মিলগেটে ধরনা দিলেও কর্তৃপক্ষ টাকা দিতে পারেননি। 

চিনিকলের সিবিএ সভাপতি সাজেদুল ইসলাম শাহীন ও সাধারণ সম্পাদক উজ্জ্বল হোসেন সরদার জানান, করোনাকালীন দুর্যোগের কারণে আখ চাষী থেকে মিলের শ্রমিক-কর্মচারী সংকটে আছেন। সরকারি সব প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীরা ২০১৫ সালের মজুরি কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বাড়তি বেতন-ভাতা পেয়েছেন। কিন্তু পাবনা চিনিকলে সেই সুপারিশ এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। কর্তৃপক্ষ আর্থিক সংকটের কথা বলে তাদেরকে সর্বশেষ মজুরি কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বেতন-ভাতা দিচ্ছে না। এবাবদ পাবনা কলের শ্রমিক-কর্মচারীদের আরও ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে।

জানা গেছে, পাবনা চিনিকলে নিয়মিত শ্রমিক ৩৭৯ জন, মৌসুমি ২৪৯ জন, কর্মকর্তা-কর্মচারী ৩৪ জন এবং চুক্তিভিত্তিক ৩৫ জন শ্রমিক রয়েছেন। মিলের কাছে তাদেরও পাওনার পরিমাণ প্রায় ৪০ লাখ টাকা। বকেয়া বেতন-ভাতা না পেয়ে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকরাও পরিবার নিয়ে চরম সংকটাপন্ন পরিস্থিতির মধ্যে দিন অতিবাহিত করছেন। চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকরা কিছু বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য মিলের কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

অব্যবস্থাপনার কারণে সরকারি এ চিনিকলটি কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে লোকসান করে আসছে। এখন পর্যন্ত লোকসানের পরিমাণ ৬’শ কোটি টাকার বেশি। এরসাথে রয়েছে শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-ভাতা। কর্তৃপক্ষ মিল চালাতে বছর বছর সরকারি ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে রেখেছে। বছরে ঋণের সুদ দিতে হচ্ছে প্রায় ৭০/৮০ কোটি টাকার মতো। ফলে চিনিকলের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে। গত মৌসুমে উৎপাদিত ২ হাজার ১০ টন চিনি বিক্রি হয়েছে। চার হাজার টন চিনি এখনও অবিক্রীত অবস্থায় গুদামে রয়েছে। ৬০ টাকা কেজি দরে যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ২৪ কোটি টাকা।

শ্রমিক-কর্মচারীরা জানান,গত ঈদুল ফিতরের আগে তারা বকেয়াসহ সব বেতন-ভাতার সাথে বোনাসও আশা করেছিলেন। কিন্তু বকেয়া বেতন তো দূরের কথা চলতি বেতনও দেয়া হয়নি। গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে চলতি মাস পর্যন্ত  তাদের বেতন-ভাতা বকেয়া রয়ে গেছে। 

এব্যাপারে মহাব্যবস্থাপক (জিএম) প্রশাসন সাইফ উদ্দীন আহমদ বলেন, শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন বকেয়া রয়েছে ঠিকই। কিন্তু আমাদের উৎপাদিত চিনির একটি বিরাট অংশও অবিক্রীত অবস্থায় গুদামে পড়ে আছে। যার মূল্য ২৪ কোটি টাকা। চিনি বিক্রি করতে পারলে তাদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করা সম্ভব হবে।

ইত্তেফাক/এমআর