গলির শেষ মাথায় সবুজ রঙের ছেতলা যে প্রাসাদটি দেখা যায় সেটির মালিকের নাম শরিফ আল কাদেরী। আগে তার নাম ছিল শরিফুল ইসলাম। নামের আধুনিকায়নে শরিফ আল কাদেরী করা হয়েছে। আগেকার দিনে রাজা-বাদশারা যেমন মসনদে বসার সময় নাম ধারণ করতেন ঠিক তেমন। ইদানীং তিনি জনকল্যাণে মনোযোগী হয়েছেন এবং শোনা যায় একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলে নামও লিখিয়েছেন। আগামী বছর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কমিশন পদে নমিনেশন পাওয়ার জন্য তত্পরও আছেন। সপ্তাহে একদিন সন্ধ্যার দিকে মহল্লার বড় নেতার বাড়িতে যান। চান্দামান্দাও নাকি দেন—দারোয়ানের মুখে শোনা। সত্য-মিথ্যা দারোয়ানই জানে। শুধু দারোয়ান নয়, ড্রাইভার আসলামও জানে এসব কথা।
নতুন একজন প্রাইভেট সেক্রেটারি না থাকলে এই যুগে নেতা হওয়া যায় না। প্রাইভেট সেক্রেটারি কাম কেয়ারটেকার। সহজ সরল গ্রামের ছেলে আহসান। সুঠাম শরীরটা যেন শাল কাঠের। তবে স্বভাব অতি কোমল ও ভদ্র। পাসও কম দেয়নি। এমএ পাস। একটি চাকরির আশায় কাদেরী সাহেবের কাছে এসেছিল এবং তিনি তাকে চাকরি দিলেন। এর আগে অবশ্যই একই পদে আরো হাফ ডজনকে বিদেয় করেছেন।
দারোয়ান আগেই আহসানকে বলেছে কাদেরী বেতনটেতন দেয় না। মুখে মধু কিন্তু অন্তরে বিষ। দারোয়ানের কথা আহসান বিশ্বাস করেনি। কাদেরী মাথায় হাত বুলিয়ে কথা বলেন, তখন আহসান যেন দুনিয়ায় থেকে স্বর্গ দেখতে পায়। আরো ভালো চাকরির স্বপ্নও দেখান। মনে মনে বলে এমন ভালো মানুষও দুনিয়াতে নেই। ফেরেশতা যেন। এক মাস গেল। বেতনের নাম নেই। আহসানের মন খারাপ দেখে, মাথায় হাত বুলিয়ে এক শ টাকা দিয়ে বললেন, এই মাসে বেশ ঝামেলা আছে, আগামী মাস থেকে ঠিক হয়ে যাবে।
ঠিক হয়নি। দুই মাস, তিন মাস, চার মাস এভাবে ছয় মাস গেল। ছয় মাসে হাজার বারো শ টাকা দিয়েছেন। শুধু মধুর কথা বলেন তিনি, কিন্তু বেতন দেন না। ড্রাইভারকেও এভাবে কোনো মাসে বেতন দেন, কোনো মাসে দেন না।
একদিন দারোয়ান দূর থেকে হেসে হেসে আহসানকে জিজ্ঞেস করল, কী ভাই? লোক কেমন?
রাগে-দুঃখে আহসান কথা বলেনি।
এক সকালে শরিফ আল কাদেরী একটি মিটিংয়ে যাবেন। ব্যাগ বহন করার জন্য সঙ্গে প্রাইভেট সেক্রেটারিও থাকা চাই। নিচে দাঁড়িয়ে আছে আহসান। গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করেছে ড্রাইভার। আগে যেমন কাদেরী সাহেব লিফট থেকে নামতেই দৌড়ে যেত আহসান, আজকে যায়নি। হাতের ব্যাগটি নেয়নি। মূর্তির মতো অনড় দাঁড়িয়ে থাকে আহসান।
কাদেরী সাহেব সেই মায়াবী ডাক দেয়, আহসান মিয়া।
আহসান যদিও সিগারেট খায় না, কিন্তু আজকে সে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে জ্বালিয়ে কাদেরী সাহেবের দিকে ধোঁয়া ছোড়ে নিঃশব্দে।
ক্রোধে কাদেরীর মুখ রক্তিমাভ হয়ে উঠলেও আহসানের ড্যামকেয়ার ভাব।
দূর থেকে দৃশ্যটি দেখে দারোয়ানের বেশ ভালো লাগে। সে অনুচ্চারে বলল, উপযুক্ত ভ্যাক্সিন।
গাড়িতে যেতে যেতে কাদেরী সাহেব ড্রাইভারকে বলল, ছেলেটা তো খুব বেয়াদপ। একে আর রাখা যাবে না।
ড্রাইভার বলল, জি স্যার। এটা আপনার জন্য একটা ভ্যাক্সিন। আপনি মানুষকে শুধু খাটান, বেতন দেন না। এজন্য আরো দুই ডোজ ভ্যাক্সিন রেডি হয়ে গেছে।
ড্রাইভারের কথা শুনে কাদেরী সাহেব পাথরের মতো স্থির থেকে কিছুক্ষণ পর জিজ্ঞেস করল, আরো দুই ডোজ?
ড্রাইভার বলল, জি স্যার। আমি দেব একটা ঘুষা ভ্যাক্সিন আর দারোয়ান দেবে ফাইনাল ঠ্যাঙ্গা ভ্যাক্সিন।
কাদেরীর শিরদাঁড়া বেয়ে একটি হিমধারা নিচে নেমে আসে। অনেকক্ষণ পর রোবটের মতো বলল, ওরে, গাড়িটা বাসার দিকে ঘোরা আর ঐ গানটা একটু বাজা তো।
কোন গানটা স্যার?
ঐ যে, আইল ডিঙ্গায়া ঘাস খাওয়া...।
গাড়িটি বাসার দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে যায়। মৃদু সুরে গান বাজে, চিরদিন ইচ্ছা মনে আইল ডিঙ্গায়ে ঘাস খাওয়া...